• call Us: +8801713046073

মমতাদি || মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় || নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ || প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

মমতাদি || মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় || নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ || প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

মমতাদি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ

প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

 

চরিত্র পরিচিতি

মমতাদি: ২৩ বছর

সুরেশ: খোকা বাবু, ১২ বছর

অবনী: সুরেশের বোন, ০৮ বছর

মা: খোকা বাবুর/সুরেশের মা, ৩৫ বছর

নগেন: মমতাদির ¯^ামী, ৪০ বছর

পাঁচু: মমতাদির বড় ছেলে- ০৭ বছর

শিশু ছেলে- ০১-০২ বছর

মাঝবয়সী লোক: ৪৫ বছর

ডাক্তার: যে কোনো বয়সের

 

 

 

দৃশ্য: এক

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

মা (নকশা পাড়ের সাদা শাড়ি) খোকা (পাজামা ও ফতুয়া), মমতাদি (সেলাই করা ময়লা শাড়ি, পাড়টা বিবর্ণ লাল। সিঁথি পর্যন্ত ঘোমটা দেওয়া। কপালে একটা ক্ষত চিহ্ন)   বটি, সবজি কাটার মাটির জিনিসপত্র, ফুলকপি

(শীতের সকাল। রোদে বসে খোকা বাবু স্কুলের পড়া করছে। মা বসে ফুলকপি কুটছেন। মমতাদির   প্রবেশ)

মমতা : আপনারা রান্নার জন্য লোক রাখবেন? আমি ছোট ছেলেমেয়েও দেখে রাখব।

মা: তুমি রাঁধুনি?

মমতা : (চমকে গিয়ে মুখ লাল হয়ে যায়। মাথা নিচু  করে ফেলে। খানিক পরে অন্যাবশ্যক জোর দিয়ে বলে) হ্যাঁ, আমি রাঁধুনি। আমায় রাখবেন? আমি রান্না ছাড়া ছোট ছোট কাজও করব।

মা: কী নাম তোমার?

মমতা : মমতাÑ

মা: তোমাকে তো ঠিক চিনলুম না, মানে তোমার বাড়িটা কি এই মহল্লাতেই?

মমতাদি: এখান থেকে খানিক দূরেই আমরা থাকি। জীবনময়ের গলির ভেতরে সাতাশ নম্বর বাড়ির একতলায়।

মা: সেখানে তোমার কে কে আছে?

মমতা : আমার ¯^ামী আছে আর একটি ছেলে। ¯^ামীর চাকরি নেই আজ চারমাস। তাই পর্দা ঠেলে উপার্জনের   জন্য বাড়ির বাইরে এসেছি।

মা: আহা! বসো বাছা বসোÑ। (মমতাদি বসে) তা তোমাকে মাইনে দিতে হবে কত?

মমতা : তা জানি না। দু’বেলা রেঁধে দিয়ে যাবো, কিন্তু খাবো না।

মা: আচ্ছা। তুমি যখন বলবে না, তবে আমিই বলছি পনেরো টাকা মাস পাবে।

মমতা : তাতেই চলবে, আমি কাজ করবো। (খুশিতে চোখ সজল হয়ে ওঠে)

মা: আচ্ছা, তবে তুমি কাল থেকে এসো।

(মমতাদি মাথা হেলিয়ে সম্মতি দিয়ে চলে যায়। খোকাকেও তার পিছনে উঠে যেতে দেখা যায়।)

 

দৃশ্য: দুই

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (দৃশ্য-এক এর সাজ), মমতাদি (দৃশ্য-এক এর সাজ) মা (আগের মতোই)

(গেটের কাছে মমতাদির পেছন পেছন খোকা সুরেশ)

সুরেশ:     শোনো, এখনি যাচ্ছ কেন? রান্নাঘর দেখবে না? আমি দেখিয়ে দিচ্ছি এসো।

মমতাদি: (খানিক দাঁড়িয়ে) কাল দেখব। (দ্রুত চলে যায়)

সুরেশ:     (¯^গত) আহা, গলা কত মিষ্টি! চোখে-মুখে উপচে পড়া ¯েœহ! কিন্তু ব্যবহারটা এতো রূঢ়!

(সুরেশ মন খারাপ করে মায়ের কাছে আসে। মা সবজি কাটায় ব্যস্ত)

মা: সুরেশÑ

সুরেশ: কি মা?

মা: পেছনে ছুটেছিলি বুঝি ভাব করতে? ভাবিস না, তোকে খুব ভালবাসবে। (রসিকতা করে) বারবার তোর    দিকে এমন করে তাকাচ্ছিল!

(সুরেশ কিছুটা খুশি হয়ে বইয়ের কাছে গিয়ে বসে পাতা ওল্টাতে থাকে)

 

দৃশ্য: তিন

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (দৃশ্য-এক এর সাজ), মমতাদি (দৃশ্য-এক এর সাজ)   দাবার বোর্ড

(মমতাদিকে নানা কাজ করতে দেখা যায়। ঝাড়– দেওয়া, জল তোলা, মসলা বাটা। একটি চাকরকে বিড়ি    টানতে দেখা যায়। মার ধমক খেয়ে চাকর মসলা বাটতে যায়, মমতাদি সরে যায়। এসময় একটি গান চলবে।    নাম দেখানো হবে।)

মমতা

শত তারার মাঝে মমতায় ভরা কিছু তারা আছে

চাঁদের বাগে অযতনে ফুল হয়ে বিরাজে

হৃদয়মাঝে সেই তারারা পেয়েছে যে ঠাঁই

পরকে ভুলি আপন করি মমতাতেই পাই।

 

শত নদীর মাঝে মমতার জল ভরা কিছু নদী যায়

ধরার বুকে অযতনে সাগর খুঁজে পায়

সাগর তাদের আপন করে দিয়েছে যে ঠাঁই

পরকে ভুলি আপন করি মমতাতেই পাই।

 

শত পাহাড় মাঝে মমতায় ভরা কিছু পাহাড় যারা

বুক চিরে তার ধেয়ে আসে শীতলতার ধারা-

পাহাড়টাকে কেমন যেন আপন করে পাই

পরকে ভুলি আপন করি মমতাতেই পাই।

 

শত মানবামাঝে মমতায় ভরা কিছু মানুষ আসে

সমাজটাকে বড় ভাবে থাকে সবার পাশে

সবাই তাকে আপন করে কাছে পেতে চাই

পরকে ভুলি আপন করি মমতাতেই পাই।

গীতিকার: ড. মো. হারুনুর রশীদ

 

(সুরেশ বারান্দায় বসে নিজে নিজে দাবার চাল চালতে থাকে।)

সুরেশ:     কই, দু’বার করে জল চাইলাম। শুনতে পাচ্ছো?

মমতা:     (রান্নাঘর থেকে) আসছি খোকা, ভাতের মারটা ফেলেই আসছি। (জল এনে খোকার সামনে দিয়ে যায়)

সুরেশ:     এতো কাজ! হুহ্ ! আমার দিকে দেখারও সময় নেই। এভাবে কেউ জল খেতে দেয়? খাবো না জল।

(সুরেশ উঠে ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে যায়, মমতার দিকে তাকিয়ে থাকে। মমতার রান্নার কাজে ব্যস্ত)

দৃশ্য: চার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (ধুতি ও ফতুয়া) মিষ্টি, সন্দেশ, সন্দেশের কাসার পাত্র

(সুরেশকে স্কুলে যেতে দেখা যায়। একটা পাকা সড়ক দিয়ে হাঁটছে)

সুরেশ: (¯^গত) মা, আমাদের বাড়িতে মাইনে করা যে রাঁধুনিকে রেখেছেন তাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।   কিন্তু সে আমার সঙ্গে ভাব করছে না কেন? মা তো বলেছিল আমায় সে খুব ভালোবাসবে। কিন্তু কই? সে কি বুঝতে পারছে না এ বাড়ির ছোট কর্তা তার সঙ্গে কথা কইবার জন্য ছটফট করছে! ধ্যাৎ- (একটি ইটের টুকরোয় লাথি দেয়)

 

দৃশ্য: পাঁচ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (ফতুয়া, পাজামা), অবনী ( কোর্তা, ধুতি-পাজামা)    কাসার বাটি, দুটি করে রসগোল্লা ও সন্দেশ

(বাড়িতে মেহমান আসার গল্প¯^ল্প দেখানো হবে। অবনীকে ঘর থেকে বেরোতে দেখা যাবে। হাতে কাসার     বাটিতে মিষ্টি, সন্দেশ। সুরেশ লুকিয়ে লুকিয়ে যেন কী শুনছিল। অবনীকে দেখে চমকে ওঠে)

অবনী :   দাদা, বাড়িতে কুটুম এসেছে, মা তোমাকে ভিতরে যেতে বলেছেÑ

সুরেশ:     কে, এসেছে রে?

অবনী:    মামা-মামি এসেছেন, আরও কয়েকজন মানুষ।

সুরেশ:     কিন্তু আমায় কেন ডাকছে, কী নিয়ে কথা বলছে?

অবনী:    মামা তোমায় শহরে নিয়ে যেতে চান ভালো পড়াশোনার জন্যÑ

সুরেশ:     ও- এই ফন্দি! আমি তবে ভেতরে  যাবোই না। তোর হাতে কী এগুলো?

অবনী: দুটো রসগোল্লা, দুটো সন্দেশ মা তোমাকে দুটো, আমায় দুটো খেতে দিয়েছেন।

সুরেশ:     তুই আর আমি সমান? আমি তোর চেয়ে বড় না, আমায় তিনটা দে, তুই একটা খাÑ

অবনী:    না, মা সমান ভাগে খেতে বলেছেÑ

সুরেশ: শোন্ অবনী- আমায় যদি তিনটা না দিস না তবে একদিন যে স্কুলে পড়া পারিসনি, টিচার চড় মেরে গাল   লাল করে দিয়েছিল। বাড়িতে এসে মিথ্যা কথা বলেছিলি, আজ কিন্তু মা- কে বলে দেবো সব।

অবনী:    দাদা ওটা  মাকে বলো না, আমি তো এখন রোজ পড়া করে যাই, আর কোনোদিন মার খাইনি।

সুরেশ:     হ্যাঁ বলবো না, তবে আমায় তিনটা সন্দেশ দিতে হবে, ত্ইু খাবি একটাÑ

অবনী:    আচ্ছা, নেÑতুই তিনটা খা- আমি একটাÑ(অবনীর চোখে জল এসে যায়)

সুরেশ: আচ্ছা যা, তুই দুটোই খা, আমি দেখছি। (দুজনকে মিষ্টি খেতে দেখা যায়)

 

দৃশ্য: ছয়

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (ফতুয়া, পাজামা) মাটির মিষ্টির হাঁড়ি

(মমতা কাজের ছলে এটা-সেটা এখানে-সেখানে রাখে। ভাঁড়ার ঘরে সুরেশকে লুকিয়ে লুকিয়ে মিষ্টি খেতে দেখা যাচ্ছে। ভাঁড়ার ঘরে ঢুকে মমতা খানিকক্ষণ সুরেশের মিষ্টি খাওয়া চেয়ে দেখে। এক পর্যায়ে মমতা খোকার হাত খপ করে ধরে ফেলে)

মমতা: দরজার পাশ থেকে দেখছিলাম, আর কটা খাচ্ছ গুনছিলাম। যা খেয়েছ তাতেই বোধহয় অসুখ হবে, আর খেয়ো না কেমন?

(সুরেশ হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য খানিকক্ষণ চেষ্টা করে। তারপর মমতার মুখে তাকিয়ে অদ্ভুত চাহনি     দেখে হেসে সন্দেশ ছেড়ে দেয়)

মমতা: ল²ী ছেলে, এসো জল খাবেÑ

(মমতাদি সুরেশের কাঁধে হাত রেখে বের করে নিয়ে যায়)

 

দৃশ্য: সাত

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (ফতুয়া, পাজামা), মমতা (শাড়ি), মা (ভালো শাড়ি) কাঠের বেঞ্চ

(বাড়িতে মেহমান আসার গল্প¯^ল্প আবারও দেখানো হবে। একটি বেঞ্চে পাশাপাশি মমতা ও সুরেশ     বসা।)

মমতা:     খোকা, তুমি পশ্চিমের শহরে পড়তে যাবে না বুঝি! মামা যে তোমায় নিতে এসেছেন।

সুরেশ:     কোনোদিনও না। আমি কি এখন গাঁয়ে আছি? এটাই আমার প্রিয় শহর। এখান থেকে কোথাও যাব না।

মমতা:     না, তা নয়। কিন্তু দূরের শহরে থাকলে নাকি লেখাপড়া ভালো হয়Ñ

সুরেশ:     ওসব বাদ দাওতো এখন। আচ্ছা, বামুনদিÑ

মমতা:     (চমকে ওঠে, যেন তাকে গাল দেওয়া হয়েছে)

সুরেশ:     কী হলো বামুনদিÑ?

মমতা:  (এদিক-ওদিক তাকাল। রান্নাঘরে ডালে খানিকটা নুন দিয়ে সুরেশের গা ঘেঁষে বসল। গম্ভীর মুখে বলল-)    আমায় বামুনদি বলো না খোকা। ওটা একটা আলাদা জাত। শুধু দিদি বলো। তোমার মা রাগ করবেন     দিদি বললে?

(সুরেশ না’সূচক মাথা নাড়ল। মমতা ছোট এক নিঃশ্বাস ফেলে সুরেশকে খুব কাছে টেনে নিল। সুরেশ     লজ্জা পেয়ে কোঁকড়া হয়ে যেতে লাগল। এরপর দু’জনে খুব গল্প করতে লাগল। দূর থেকে দেখানো     হবে। কোনো গল্প শোনা যাবে না।)

মা: সুরেশÑ সুরেশ- (তাদের কাছে আসে) এই তুই এখানে? কত  করে তোর একবার ডাকছেন। যেতে নেই    বুঝি?

(মমতা দু’হাতে একরকম সুরেশকে জড়িয়ে ধরে ছিল। হাত সরিয়ে হঠাৎ ধরা-পড়া চোরের মতো বিব্রত    হয়ে উঠল। কিন্তু সেটা মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই সুরেশ-এর কপালে চুম্বন করে বলল-)

মমতা:     এতো কথা কইতে পারে আপনার ছেলে!

মা: ও, ওইরকম। সারাদিন বকবক করে। বেশি আশকারা দিও না। জ্বালিয়ে মারবে। (মা চলে গেলেন।     মমতা’র চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা অশ্রæ টপটপ করে ঝরে পড়ল।

 

দৃশ্য: আট

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (স্কুলের পোশাক), মমতা-শাড়ি কমলালেবুর ডালি ও  দোকান

(একটি গলির মোড়ে মমতাদিকে কমলা কিনতে দেখা যায়। সুরেশ স্কুল থেকে ফেরার সময় সেখানে     দাঁড়ায়)

সুরেশ:     মমতাদি কটা কমলালেবু কিনলে?

মমতা:     দুটো। একটা আমার ছেলে আর একটা তার বাবা।

সুরেশ: আমার জন্য একটা কিনো, আমিও খাবো কমলালেবু

মমতা:     সেকি খোকা! তুমি তো এখন বাড়িতে গিয়ে ভাত খাবে। এটা-ওটা খেলে মা বকবেন যে!

সুরেশ:     না, আমি এখন বাড়ি যাবো না, তোমার বাড়িতে যাবো।

মমতা:     কী বলছো- আমার বাড়িতে! কেন?

সুরেশ:     তোমার বাড়িটা দেখতে যাবোÑ

মমতা:  না, মা তোমায় খুঁজবেন যেÑ

সুরেশ:     না, খুঁজবে না। চলতো।

মমতা:  তবে কমলালেবু কিনি আরও-

সুরেশ:     তা কিনতে হবে না। এটাই ভাগাভাগি করে খাবোÑএসো এসো(সুরেশ মমতাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে   যায় গলিপথ ধরে)

দৃশ্য: নয়

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (স্কুলের পোশাক), মমতা-শাড়ি, মাঝবয়সি ফরসা লোক (ধুতি-ফতুয়া)

(গলি দিয়ে পাশাপাশি হাঁটছে মমতা ও সুরেশ। গলিটা দুর্গন্ধময়। নাকে হাত চাপা দিয়ে হাঁটছে সুরেশ।)

সুরেশ: দিদি, তোমাদের এই গলির নাম কী?

মমতা: জীবনময় লেনÑ

সুরেশ: হা হা হাÑ

মমতা: হাসছো কেন?

সুরেশ: এই বিশ্রী, নোংরা, যমালয়ের পথটার নাম কে ঠাট্টা করে জীবনময় লেন রেখেছিল তাই ভেবে হাসছি।

(দুপাশে বাড়ির চাপে অন্ধকার। এখানে ওখানে আবর্জনা জমা করা।)

মমতা: মনে হচ্ছে পাতালে চলেছ না?

সুরেশ: না, তা নয়।

(একজন মাঝবয়সি ফরসা লোকটি ইচ্ছে করে মমতাকে গা ঘেঁষিয়ে দেয়।)

ফরসা লোক: (চাপা গলায়) কেমন আছো?

(মমতাদি কোনো জবাব না দিয়ে বিরক্ত হয়ে এগিয়ে যায়)

সুরেশ: কে এই লোকটা দিদি?

মমতা: আমার আত্মীয় হয়, ঠাট্টার সম্পর্ক।

(দোতলা একটা ছোট বাড়ির ভেতর দিয়ে ঢোকে।)

 

দৃশ্য: দশ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (স্কুলের পোশাক), মমতা-শাড়ি টেবিলে কয়েকটা বই-খাতা। একটা ঘড়ি, কয়েকটা ওষুধের শিশি।

( ছোট্ট একটি দোতলা বাড়ি। দুখানা কুঠুরি। ঘরের সামনে দুহাত চওড়া বারান্দা। চটের বেড়ার অস্থায়ী    রান্না ঘর। ঘরে ছোট জানালা। ঘরের একপাশে বড়ো চৌকি। তাতে গুটানো মলিন বিছানা। চৌকির তলে   একটি চরকা আর ভাঙা বেতের বাস্কেট। ঘরের একপাশে দুটো ট্রাংক। দড়ি দিয়ে বাঁধা ভাঙা টেবিল।     টেবিলে কয়েকটা বই-খাতা। একটা ঘড়ি, কয়েকটা ওষুধের শিশি। একটা আয়না। কয়েকটা ভাঁজ করা সংবাদপত্র।

চৌকিতে মাদুরের ওপর একটি ছোট বাচ্চা শোয়ানো। মমতাদি ঘরে ঢুকে বাচ্চা টির গাঁয়ে হাত দিল। গুটানো বিছানার ভেতর থেকে লেপ, বালিশ টেনে বার করল। সাবধানে ছেলেটির মাথার নিচে বালিশ     দিয়ে লেপ দিয়ে গা ঢেকে দিল।)

মমতা: কাল সারারাত পেটের ব্যথায় নিজেও ঘুমায়নি, আমাকেও ঘুমুতে দেয়নি। উনি তো আমার ওপর রাগ করেÑকই তুমি লেবু খেলে না?

সুরেশ: (কমলালেবু ছিলে খেতে শুরু করে। মমতাদি কিছুক্ষণ বসে খাওয়া দেখে।) মুড়ি ছাড়া ঘরে কিছু নেই।   দোকানের বিষও খেতে দেব না। একটা লেবু  খাওয়াতে তোমাকে সঙ্গে আনলাম।

সুরেশ: এই লেবুটাও খাব দিদি।

মমতা: কৃতার্থ হলাম। সবাই যদি তোমার মতো ভালবাসত। তুমি খেয়ে বাইরে এসে বসো ভাই, আমি ঘরের কাজগুলো সেরে নেই।

(বাইরের মাদুরে বসা সুরেশ। মমতা ঘর ঝাঁট দিল, কড়াই ধুয়ে আনল। তারপর মশলা বাটতে বসল।    হঠাৎ বললÑ)

সুরেশ: দিদি, এ বাড়িতে আর কে থাকেন?

মমতা: কেনরে আমার বর, সে কি তুমি জানো না? একটু পরেই আসবে। মস্ত বড়ো বীর পালওয়ান।

সুরেশ: খুব ভয়ানক?

মমতা: সেরকম নয়, শক্তের ভক্ত, নরমের যম। একটু  পাগলাটে। তুমি এবার বাড়ি যাও ভাই, তোমার খিদে     পেয়েছে।

সুরেশ: আচ্ছা। (ধীরে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি যেতে শুরু করে)

 

দৃশ্য: দশ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সুরেশ (বাড়ির পোশাক), অবনী (বাড়ির পোশাক) মমতা-শাড়ি চিরুনি, ক্লিপ

( অবনীর চুল বেঁধে দিচ্ছে মমতা।)

অবনী:    দিদি, তুমি যেভাবে সুন্দর করে চুল বাঁধো সেভাবে আমায় বেঁধে দাও।

মমতা:     আচ্ছারে বুড়ি, আমার মতো করেই দিচ্ছি। এই হয়েছে, দেখো এবার।

অবনী: তোমার চুলটা আগে দেখে নিই। তারপর আরশিতে গিয়ে মিলিয়ে নেবো। (অবনী দেখতে পায় মমতা’র    গালের চড়ের আঙুলের দাগ) তোমার গালে চড়ের দাগ কেন? আমার মাস্টার মশায় একদিন এমন করে     আমায় মেরেছিলেন। যাই মাকে বলিগে। মা, মা।

(সুরেশ আসে)

সুরেশ: কী হয়েছে অবনী?

অবনী: দাদা, দেখো, দিদির গালে মারের দাগ।

মমতা: না- ওটা তেমন কিছু নয়।

অবনী: যাই আমি মাকে ডেকে আনি, মা- মা-

সুরেশ: এই তুই পেটে কোনো কথা বলতে পারিস না? তুই যদি এটা  মাকে বলিস, তোর মারের কথাও কিন্তু মাকে বলে দেবো।

অবনী: আচ্ছা দাদা, আমি কাউকে বলবো না।

সুরেশ: এখন যা তবে-(অবনী চলে যায়) সত্যিই তো। তোমার গালে আঙুলের দাগ কেন? কে চড় মেরেছে?

মমতা: (চমকে গালে হাত চাপা দেয়) দূর! (হাসার চেষ্টা করে) আমি নিজে মেরেছি। কাল রাতে গালে একটা মশা   বসেছিল। খুব রেগেÑ

সুরেশ: মশা মারতে গালে চড়। হা হা হা। (মমতাও হাসতে হাসতে হঠাৎ আনমনা হয়ে গেল। চোখের কোনে    পানি দেখা যায়। মুখ কালো হয়ে যায়। ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে ধরে। সুরেশ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়েÑ)

তুমি মিথ্যে বলছো দিদি। কেউ তোমায় মেরেছে।

মমতা: (কাঁদো কাঁদো  হয়ে) না ভাই, না। সত্যি বলছি, না। কে মারবে?

(সুরেশ জবাব খুুঁজে পেল না। গালে হাত বুলিয়ে দিতে গেল। মমতা হাতটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল)

মমতা: কারও কাছে যা পাই না। তা তুমি দেবে কেন?

সুরেশ: (অবাক হয়ে) কী দিলাম আমি?

(মমতা তরকারি নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পিঁড়িতে বসে খোঁপা খুলে দিলে পুরো পিঠ ঢাকা পড়ল। সুরেশ  পিছনে গিয়ে চুলগুলি খোঁপা বেঁধে দিতে চেষ্টা করলো। মমতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে)

সুরেশ: আচ্ছা দিদি, তোমার বরের চাকরি হলে তুমি কী করবে?

মমতা: তুমি কী করতে বল? হরির লুট দেব না তোমায় সন্দেশ খাওয়াব।

সুরেশ: ধেৎ তা বলছি না। তোমার বরের চাকরি নেই বলে আমাদের বাড়িতে কাজ করছো, তো চাকরি হলে তো    করবে না।

মমতা: (হাসল) করব। এখন করছি যে?

সুরেশ: তোমার বরের চাকরি হয়েছে?

মমতা: হয়েছেÑ (গম্ভীর হয়ে গেল)

সুরেশ: আচ্ছা এতো ভালো খবর! আগে বলোনি। পাড়ার মহিলাদের মা সেদিন বলছিল, আহা বেচারির চাকরি   নেই। সেটা শুনে আমি খুব দুশ্চিন্তা করেছি। হুঁম (উঠে যায় সুরেশ)

 

দৃশ্য: এগার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

নগেন (গায়ে কোট, চুল মেয়েলি ধরনের, লম্বা-ঢ্যাঙ্গা, দাঁতগুলো কালো টুল, মাদুর

( মমতার বাড়িতে সুরেশ মাদুরের ওপর বসা। সামনে মমতা।)

মমতা: খোকা, তুমি রোজ রোজ আমাদের এই ভাঙ্গা ঘরে কেনো আসো?

সুরেশ: ভালো লাগে, তাই আসি। কেন যেন মনে হয় তোমায় কেউ ভালো বাসে না, তাই গল্প করতে আসিÑ

মমতা: তুমি ভালোবাসা বোঝো?

সুরেশ: সেটা বুঝি না, কিন্তু মা আমায় খুব ভালোবাসেন, সেটা বুঝিÑ

(লম্বা পায়ে নগেন বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ায়। সুরেশকে নিরীক্ষণ করে)

নগেন: তুমি কে হে?

(মুখের দুর্গন্ধে সুরেশ মুখ সরিয়ে নেয়।)

সুরেশ: আমি সুরেশ।

নগেন: সুরেশ নাকি? বেশ দাদা বেশ। তা আমার বাড়িতে হঠাৎ সুরেশের আমদানি কী জন্য? এ বাড়িতে সুরের    রেশটুকুও যে নেই দাদা? ওর জন্য নাকি?

মমতা: এসব কী বলছ ছেলে মানুষকে? আমি ওদের বাড়ি কাজ করি। ওকে আমি ডেকে এনেছি। ওকে ভয়   দেখাচ্ছ কেন?

নগেন: সোজা হয়ে) ভয় দেখাচ্ছি? বড়ো যে লম্বা-চওড়া কথা শিখেছ। আমি ভ‚ত নাকি যে ভয় দেখাব?

(মমতা মশলা বাটতে লাগল। নগেন কোটের পকেট থেকে বিড়ি বার করে ধরাল। আচমকা নিচু হয়ে হা   করে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁপানির মতো  হাসে। )

সুরেশ: (বিড়ির ধোঁয়া কাশে)

মমতা: ও কি কর? (শিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়)

নগেন: (ফের সোজা হয়ে) তুমি ফোঁড়ন কাটছ কেন? ঠোঁট দুটো বন্ধ করে রাখতে পার না? (মমতার ঠোঁটে টোকা   দেয়)

বেড়ে দেখাচ্ছে তোমায় মাইরিÑখাসা। বোধহয় গালে টোকা দিলে আরও বেড়ে দেখাবে। দেব?

মমতা: খোকার টনিক বুঝি নিজেই গিলে এসেচ?

নগেন: আলবত। খোকা টনিক দিয়ে করবে কী? এখনও খোকার টনিক খাওয়ার বয়স হয়নি। টনিক লাগে আমার     মতো নগেনদের। (সগর্বে নিজের বুক ঠোকে। তারপর জ্বলন্ত বিড়িটা সুরেশের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে হাত    পিছনে দিয়ে দুলে দুলে হাসতে থাকে)

মমতা: তুমি ওর সঙ্গে অমন করছ কেন? এর ফল কী হবে তুমি জান?

নগেন: জানি, হাত দিয়ে আমার মাথাটা কচাত করে কেটে নেবে।

মমতা: তোমার মাথার কিছু হবে না। চাকরি যাবে আমার। তুমি কি মনে করো ও বাড়ি ফিরে তোমার ব্যবহারের কথা বলে দিলে আর একদিনের জন্যও ওর মা আমাকে রাখবেন? যা খুশি তোমার করো, কিন্তু কাজ     গেলে আমাকে দুষো না।

নগেন: (হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পায়) ইস! সেটাতো খেয়াল করিনি! আগে বলতে হয়। (মুখ করুণ করে) তা খোকাবাবু    বাড়িতে বলতে যাবে কেন? আমি ঠাট্টা  করছিলাম বৈ ত নয়। ঠাট্টা শুনে বাড়িতে রাগ করবে, বাড়িতে   নালিশ করবে, খোকাবাবুকে তুমি এত বোকা ভাব নাকি?

মমতা: কী জানি! কাল চাকরি থাকবে কি যাবে দেখেই সেটা বোঝা যাবে। খোকার রাগ তুমি জান না। (মমতা ঘরে চলে যায়)

নগেন: (ধপ করে পাশে বসে। গলা নিচু করে বলে-) চুপি চুপি না হয় তোমার পা ধরছি ভাই। রাগ করো না।   আমি না বুঝে বড্ড দোষ করেছি। অনুতাপে এখন আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। মাইরি বলছি। কালির   দিব্যি। (নগেনের চোখ ছলছল করতে লাগল)

(সুরেশ কী বলবে ভেবে পায় না। )

সুরেশ:  না-না এরকম -।

নগেন: (কাতর ¯^রে) বাড়িতে বলো না ভাই। মরে যাব। তোমার দিদি পর্যন্ত যে উপোস করবে রে দাদা।

সুরেশ: আহা আমি রাগ করিনি, বাড়িতেও বলব না।

নগেন: (¯^াভাবিক হয়ে) তুমি বড়ো নিষ্ঠুর ভাই! পায়ে ধরালে, কান মলালে তবে ক্ষমা করলে। তুমিই বলো, শুধু     ক্ষমাতে কি এখন মন ওঠে? ক্ষমার সঙ্গে একটু দয়াও করে ফেলো, আমার সব দুঃখ দূর হয়ে যাক। বেশি    নয় ভাই, একটু দয়া। যৎসামান্য।

সুরেশ:     কী বলুন?

নগেন: বলছি। কিন্তু মনে রেখো আমার জন্য চাইছি না দয়া। তেমন পাত্র আমি নই। নিজের দুঃখের কথা আমি কাউকে বলি না। কার জন্য দয়া চাই জান? তোমার ওই দিদির জন্য। ওর বড় লজ্জা। তাই মুখ ফুটে     বলতে পারে না। আমার কাছে কাঁদে আর বলে পনের টাকায় কুলোয় না। কী করি আমি, একদিন বিষ   খেয়ে মরে যাব। মাইরি, ও বলে আর হাউমাউ করে কাঁদে। সে কান্না দেখলে পাষাণেরও বুক ফেটে যায়। কালির দিব্যি। তুমি যদি মাকে বলে  দুটাকা মাইনে বাড়িয়ে দিতে পার তবেই সর্বরক্ষে হয়। নইলে রোজ    ওর বুকফাটা কান্না আর সয় না। (মাথা না-সূচক নাড়ে)

সুরেশ: আমি মাকে বলব মমতাদির বেতন দু’টাকা বাড়িয়ে দিতেÑ

নগেন: (কৃতজ্ঞতায় সুরেশকে সশব্দে চুম্বন দেয়। এরপর ভড়কে পিছনে গিয়ে হাতজোড় করে) চটো না দাদা।   তোমায় বড়ো ভালবাসি কি না। তাই সামলাতে  পারলাম না। (যুক্তকর মুক্ত করে বলে) কী ভাবছি জান    দাদা? ভাবছি দু’টাকায় কি তোমার দিদির কান্না ঘুচবে? অভাবের সমুদ্রে দু’টাকা দু ফোঁটা শিশির বৈ ত    নয়। তুমি বরং পাঁচ টাকার কথাই বলো। কেমন? তোমরা হলে রাজা মানুষ। পাঁচ টাকা তোমাদের কাছে পাঁচটা পয়সা। অ্যাঁ।

সুরেশ: (হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ে)

নগেন: ওকে বলো না কিন্তু। ওর বড় লজ্জা কি না। কেঁদে কেটে অসুখ করে ফেলবে। হয়তো লজ্জায় বিষও খেয়ে     ফেলবে। জান, ওর কাছে আধ ভরি আফিং আছে।

(মমতা বেরিয়ে আসে।)

মমতা: চলো খোকা আমরা যাই।

নগেন: তুমি কোথা যাবে শুনি?

মমতা: দুবেলা যেখানে রাঁধতে যাই, সেখানে আবার কোথা?

নগেন: কী? উনুন ধরাবে কে? ভাত চাপাবে কে?

মমতা: তুমি, আমার আজ সময় নেই।

নগেন: তোর সময়ের নিকুচি করেছে। রোজ ভাত নামিয়ে নিই তাই তোর বাবার ভাগ্য জানিস? উনুন ধরা ভাত   চাপা, তারপর যেখানে খুশি মরবি যা।

মমতা: (আঙিনা থেকে আবার উঠে আসে) বেশ, সব করেই দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কাল চাকরি গেলে ্আমায় মারতে   উঠো না যেন।

নগেন: (নরম হয়ে) চাকরি যাবে কেন?

মমতা: কেন? বেশ! সময়মতো কাজে না গেলে কে পয়সা দিয়ে লোক রাখে? নটা বাজতে না বাজতে নাকেমুখে ভাত গুঁজে আপিসে ছোটো কী জন্য? তোমার চাকরি, আমার চাকরি নয়?

নগেন: (নরম ¯^রে) তোমার কাজে যাবার সময় নাকি? তবে তুমি যাও। দেরি করো না। চলে যাও। এদিকে যা হবার হবে।

মমতা: এদিকে সব হবে। তুমি ভেব না। খোকার অসুখ, আমি শিগগির ফিরে আসব। (চলে যায়)

দৃশ্য: বার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

মা (শাড়ি- ফুলকলি ব্লাউজ)  কাঠের হাতল চেয়ার-১টা

( মা চেয়ারের ওপর বসা। মায়ের পাশে দাঁড়ানো সুরেশ)

মা: মমতাÑ মমতাÑ

মমতা: (আসে) মা, ডেকেছেন?

মা: হুঁÑ শুনলাম তোমার বরের চাকরি হয়েছে?

মমতা: হয়েছে (গম্ভীর হয়ে যায়)

মা: অন্য লোক ছেড়ে ঠিক করে দিতে পারছ না বলে তুমি কাজ ছেড়ে দিতে ইতস্তত করছ? তার কোনো দরকার নেই। আমরা তোমায় আটকে রাখব না। তোমার কষ্ট দূর হয়েছে তাতে আমরাও খুশি। তুমি ইচ্ছে করলে এ বেলাই কাজ ছেড়ে দিতে পার, আমাদের অসুবিধা হবে না।

মমতা: (চোখে জল এল) আমি কাজ করব।

মা: ¯^ামীর চাকরি হয়েছে তবু?

মমতা: তাঁর সামান্য চাকরি, তাতে কুলোবে না মা। আমায় ছাড়বেন না। আমার কাজ কি ভালো হচ্ছে না?

মা:  অমন কথা তোমার শত্রæও বলতে পারবে না মা। সেজন্য নয়। তোমার কথা ভেবেই আমি বলছিলাম। তোমার    ওপর মায়া বসেছে। তুমি চলে গেলে আমাদেরও কি ভালো লাগবে?

(মমতা উঠে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে যায়। পিছু নিল সুরেশ)

 

দৃশ্য: তের

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

মমতা (শাড়ি), সুরেশ (বাড়ির পোশাক)  রান্নাঘরের হাঁড়ি, লাকড়ি

( সুরেশ রান্নাঘরে ঢুকে দেখল মমতা কাঁদছে। )

সুরেশ: দিদি, তুমি কাঁদছ কেন?

মমতা: (আচমকা) মিথ্যে বললে কী হয় খোকা?

সুরেশ: পাপ হয়Ñ

মমতা: গুরুনিন্দা বাঁচাতে মিথ্যা বললেÑ

সুরেশ: উম্ (খানিকক্ষণ ভাবে) তাতে একটুও পাপ হয় না। সত্যি। কাঁদছ কেন?

মমতা: নাহ্! কাঁদছি কই? তুমি যাও খোকা সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অবনীকে একটু পড়া শিখিয়ে দাও।

সুরেশ: (¯^াগত) গুরুনিন্দা পাপ, মিথ্যা বলাও পাপ। কিন্তু কোনটা বেশি পাপ তাতো বুঝতে পারছি না। (ধীরে     ধীরে হেঁটে আসে)

(চারমাস পরে)

দৃশ্য: চৌদ্দ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

ডাক্তার, মা, সুরেশ, অবনী    বিছানা, টিনের বালতি- সিলভারের মগ,  ডাক্তারি ব্যাগ

( মা বিছানায় শোয়া। মাথায় পানি ঢালছে সুরেশ। অবনী মায়ের পা টিপে দিচ্ছে। ডাক্তার বাবু আসেন)

ডাক্তার: কই সুরেশ, তোমার মা অসুস্থ, খবর দিয়েছিলে কিন্তু আরেকজন রোগী দেখে আসতে খানিকটা দেরি হয়ে     গেল। দেখি দেখি কী হয়েছে?

সুরেশ: মায়ের কাল থেকে খুব জ্বর ডাক্তার মশায়Ñমাথা তুলতে পারছে না। সকাল থেকে জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছি      কিছুতে জ্বর নামছে না।

অবনী: ডাক্তার বাবু, আমার মাকে ভালো করে দিন না। আমি কাল থেকে ইস্কুলে যাইনি। ইশকুল কামাই দিলে         মাস্টার মশায় বকা দেন।

ডাক্তার: হুম। দেখছি। (নাড়ী দেখে। কপালে হাত দেয়। জিভ দেখে। চোখ দেখে।) না তেমন সমস্যা নয়।     তিনদিনের ওষুধ লিখে দিচ্ছি। ঠিক হয়ে যাবে। এরপরেও জ্বর এলে হাসপাতালে নিতে হতে পারে।   আমায় খবর দেবে আমি ব্যবস্থা করে দেবো। আর এই মুহূর্তে উনার যতœ দরকার। তোমাদের এমন কেউ   নেই যিনি ওনাকে সেবা-যতœ করতে পারেন। তোমরা ছোট-মানুষ কীভাবে কী করবে একটু দেখো। আজ     চলি তবে।

মা: (বালিশের নিচ থেকে টাকা বের করে দেয়) সুরেশ, ডাক্তার বাবুকে এগিয়ে দিয়ে আয়। (টাকা দিয়ে) আর এই যে ওনার সম্মানিটা দিয়ে দিস বাবা।

সুরেশ: আচ্ছা মা-(ডাক্তার ও সুরেশ বেরিয়ে যায়)

অবনী: মা, তুমি তিনদিনে ভালো হয়ে যাবে তাই না মা? ডাক্তার বাবুতো এটাই বললেন।

মা: হ্যাঁ মা। তুই ভাবিস না। আমি তার আগেই ভালো হয়ে যাবো। জ্বরটা খানিকটা কমলেই আমি সেরে উঠবো।

(সুরেশ আসে। মা উঠে বসার চেষ্টা করে)

সুরেশ: মা ওঠো না। ও কি করছো?

মা: বাবা, সুরেশ আজ পনের দিন যাবৎ ঠাকুর কাজ করতে আসছে না। আমি যে আর পারছি না বাবা। তোদের দু’ভাইবোনের খাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। তোমার মমতাদিকে একবার ডেকে আনতে পারিস? ওর কোলে যে নতুন বাবুটা এসেছে সেটার বয়স তো চার-মাস হয়ে গেল। এখন মনে হয় বাইরে বেরুতে পারবে।     দু’দিন যদি তোদের দেখে রাখত, রেঁধে খাওয়াতো!

সুরেশ: আমি আজ স্কুলে যাবার পথে দিদির বাড়িতে যাবো মা। দিদিকে ডেকে আনতে হবে। নইলে তোমার খুব অসুবিধা হবে। এমন দিনে আমাদের মানুষ ছাড়া চলবে না মা। অবনী: দাদা, আমিও ইশকুলে যাবোÑ

সুরেশ: তুই আজ মার সঙ্গে থাক অবনী। আমি কাল মার সঙ্গে থাকবো। তুই ইশকুলে যাস। দুজনে একসঙ্গে    ইশকুলে গেলে মা-কে কে দেখবে বল। ল²ী বোন আমারÑ(সুরেশ বেরিয়ে যায়)

দৃশ্য: পনের

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

মমতা, সুরেশ, নগেন, পাঁচু, ছোট বাচ্চা খড়ম, পিঁড়ি, মাদুর, টুল, কাজলদানিসহ কাজল, বাচ্চাদের কাঁথা

(নগেন অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে বারান্দায় টুলে বসে পান চিবাচ্ছিল। আর গর্জন করে কী সব     বলছিল। ছোট বাচ্চাটিকে কাজল পরিয়ে দিচ্ছে মমতা। উঠানে উপুড় হয়ে হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে   প্রাণপণে চেঁচাচ্ছে মমতাদির বড়ো চেলে পাঁচু।)

(নগেন সুরেশকে সাদরে অভ্যর্থনা করে। নিজে মমতা’র পিঁড়িটা টেনে নিয়ে সুরেশকে টুলে বসাল।)

নগেন: কেমন আছো সুরেশ বাবু? তোমার জন্য কদিন ধরেই না আমার মনটা কেমন জানি করছিল।

(মমতা হেসে সুরেশকে ¯^াগত জানায়)

সুরেশ: পাঁচু কাঁদছে কেন?

নগেন: ও শুয়ারকা বাচ্চার কথা বলো না ভাই। হারামজাদা দু’এক বছরের মধ্যে জেলে ঢুকবে। এই বয়সে এমন   পাকা চোর হয়ে উঠেছে যে বললে তুমি বিশ্বাস করবে না। চুপ করলি পাষণ্ড, ইস্টুপিড নারকী? চুরি করে   মার খেয়ে কাঁদিস তোর লজ্জা নেই।

(সুরেশ পাঁচুর দিকে তাকিয়ে দেখে তার পিঠে অসংখ্য মারের দাগ। পাশে পড়ে আছে একটা ভাঙা চ্যালা কাঠ।)

সুরেশ: আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, দিদির ছেলে চোর! (মমতা মাথা নিচু করে দেয়) কী চুরি করেছে?

নগেন: পয়সা। খাবার নয়, খেলনা নয়, পয়সা। তাও কি আমাদের পয়সা? ওই ওদের (আঙুল দিয়ে দোতলাটা    দেখায়)। বালিশের তলা হাতড়ে পাঁচসিকে চুরি করে পালাচ্ছিল, যাদববাবু দেখতে পেয়ে চোর ছেলে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন। সঙ্গে যাচ্ছেতাই গালাগালি।

(সুরেশ মমতাদির দিকে তাকায়। মমতা আরও মাথা নিচু করল। খোকার চোখে কাজল দিতে দিতে তার   আঙুলের থরথর কম্পন দেখা যায়)

নগেন: যা, দূর হয়ে যা কুলাঙ্গার। (এরই মধ্যে পাঁচু উঠে দাঁড়িয়েছে। গুটিগুটি পায়ে বাইরের দিকে চলেছে। নগেন    পায়ের কাছে একটা খড়ম পেয়ে ছুঁড়ে মারে পাঁচুর দিকে। ওটা দেয়ালে লেগে পাঁচুর পায়ের কাছে ছুটে আসে। পাঁচু খড়মটা তুলে নিয়ে জিভ বার করে বাবাকে ভেংচি কাটল। তারপর বাপের মাথা লক্ষ্য করে         ছুঁড়ে দৌড় দিল। খড়মটা নগেনকে না লেগে শোবার ঘরের দরজায় ঢুকে গেল। নগেন লাফিয়ে উঠে   ধরতে চায় কিন্তু নিরাশ হয়ে আবার পিঁড়িতে বসে। বিড়ি ধরাল।)

নগেন: ঠাকুর কেমন রাঁধছে গো সুরেশ বাবু? ওর রান্নার মতো হচ্ছে?

সুরেশ: ঠাকুর কাজ ছেড়ে পালিয়েছে?

নগেন: সত্যি পালিয়েছে? তবে ওকে আবার রাখ না?

সুরেশ: দিদি কি আর কাজ করবে?

মমতা: (মাথা তুলে নীরস মুখেÑ) না ভাই, দিদি আর কাজ করবে না।

নগেন: কী করবে তবে শুনি? বসে বসে গিলবে? যার তার বাড়ি নয়। আত্মীয়ের বাড়ির মতো। সেখানে কাজ     করতে তোমার আপত্তিটা কী শুনি? ওসব বজ্জাতি চলবে না বুঝলে? আমি কুঁড়োমির প্রশ্রয় দেবো না।    কাল থেকে তুমি কাজ করতে যাবে। এবার বরং দু’টাকা বেশি হবে। হবে না খোকা?

সুরেশ: হবে। (মমতাদি কথা বলল না)

নগেন: (রাগে আগুন হয়ে) যাবে না তুমি?

মমতা: না।

নগেন: না? বটে? আমি আমার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করব আর তুমি বসে বসে খাবে না?

মমতা: ¯^ামীর রোজগার খেলে স্ত্রী বুঝি বেয়াদব বেহায়া হয়? ও মা, কী লজ্জা! এমন কথা আর বলো না, মানুষ হাসবে।

নগেন: হুঁঃ, বজ্জাতি হোথা হায়। শুনবে তবে? শুনবে তবে? দু পয়সা রোজগার করে ¯^ামীর একটু সাশ্রয় করার সুযোগ যে মেয়েমানুষ হেলা করে সে শুধু বেয়াদব নয়, সে- সেÑ

মমতা: সে?

নগেন: সে কুলটা! (নগেন বিড়ি ধরায়)

(মমতা ছোট বাচ্চাটিকে তুলে ধরে চুমু খায়, গাল টিপে আদর করে, বাচ্চার হাসির জবাবে হাসে)

মমতা: তাই নাকি? তা বেশ।

(মমতা ঘরে যায়, আবার এসে ¯^ামীর গা ঘেঁষে বসে পড়ে। বারবার দুষ্টামির হাসি হাসে। হঠাৎ সুরেশের    দিকে তাকিয়ে হাল ছেড়ে দেয়। আবার চোখ লাল করে মমতার হাত খপ করে ধরে। সুরেশ-এর দিকে     মুখ ফিরিয়ে বলেÑ)

নগেন: হাঁ করে কী দেখছিস শুনি? মজা লাগছে দেখতে না? বেরো আমার বাড়ি থেকে, বেরিয়ে যা!

(সুরেশ বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় বাইরের দরজাটা টেনে দেবার সময় দেখতে পায় মমতার হাত     নগেনের গলা জড়িয়ে ধরেছে)

 

 

সমাপ্ত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  • Prev Post
  • Next Post

LeaveComment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »