• call Us: +8801713046073

মুক্তিযোগ || ড. মো. হারুনুর রশীদ || প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

মুক্তিযোগ || ড. মো. হারুনুর রশীদ || প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

ক্ষুদেনাটক

 

মুক্তিযোগ

ড. মো. হারুনুর রশীদ

প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

কাহিনিসংক্ষেপ:

(একটি মেয়ে বস্তি থেকে বাবা বিক্রি করে দেবে দালালের কাছে। বাবাটি  নেশাখোর। এরপর দালাল। সিএনজিতে মেয়েটিকে নিতে থাকে আদমপাচারকারীর কাছে। পথে পাচারকারী ডন ভাই ফোন দেয়, মেয়েটিকে ঠিকমতো ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কি না। এটা সিএনজি ড্রাইভার শুনে ফেলে সিএনজি নিয়ে টান দেয়। মেয়েটি পুলিশ পুলিশ বলে চিৎকার করলে পুলিশ সিএনজি আটকে সিএনজিসহ থানায় নিয়ে যায়। এদিকে দালাল দৌড়ে এসে মেয়েটিকে পায় এবং পুলিশকে বকশিশ দিতে চায় খুশি হয়ে। কিন্তু পুলিশ বকশিশ নেয় না। পুলিশ সিএনজিওয়ালাকে ধরে নিয়ে যায়। অন্যদিকে মেয়েটি আদম পাচারকারীদের হাতে পড়ে। সেখান থেকে এক ধনী বুড়া মেয়েটিকে টাকা দিয়ে কিনে আনে এবং তার বাড়িতে রাখে। এদিকে সিএনজিওয়ালা পুলিশকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে আসলে সে অপরাধী নয় বরং সে মেয়েটিকে বাঁচাতে চেয়েছিল। এরপর পুলিশ আদম পাচারকারীদের ঠিকানায় অভিযান শুরু করে। মেয়েটিকে পায় না। দালাল ও আদমপাচারকারী ধরা পড়ে। গ্রেফতারকৃতদের নিয়ে পুলিশ বুড়ার বাড়িতে যায়। তারপর জানা যায় যে বুড়োটি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সে ¯^াধীনতার পতাকা জড়িয়ে মেয়েটিকে পুলিশের কাছে দেয় এবং বাবার কাছে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করে। পুলিশগণ মুক্তিযোদ্ধা বৃদ্ধকে সেলুট করে। নাটক শেষ হয়)

 

 

দৃশ্য: ১

(রেললাইনের ধারে বস্তির কিছু খুপরি ঘর। একটা বয়স্ক মানুষ পাশেই একটি কোণায় এদিক সেদিক তাকিয়ে নেশা করছে। প্রথমে ইঞ্জেকশন নেয় নিজে নিজে। এরপর আফিম গাঁজা খেয়ে টানতে থাকে। একটি মেয়ে এদিক সেদিক বাবাকে খুঁজে বেড়ায়)

জুলেখা: বাবা, বাবা- এই বাবা

(লোকটি তাড়াতাড়ি নেশার সামগ্রী সরিয়ে রাখে)

জুলেখা: ছি ছি ছি বাবা, তোমারে এতবার কইরে কচ্ছি, বাবা এই নেশা ছাইড়ে দাও, ছাইড়ে দাও। এডা বলতি বলতি মা মইরে গেল। কতবার তৌবা তাহের কইরলে, তা-ও এই জম্মের পোড়া খাবার না খালি কি তোমার চলতিছে না?

বাবা: খাচ্ছি না রে মা- এট্টু কইরে ধোঁয়াডা টাইনতেছি। এডা না করলি পরে প্যাডের ভিতর টাইন্যে ধরে, গা খিচ খিচ করে, রাগ উইঠ্যে যায়, যারে তারে মারতি মন চায়…

জুলেখা: তা মারো না! আমারে তো মারিছ কতবার! সেইডাও ত ভালা। আমারে মাইরে‌্য ফেল-

বাবা: আইচ্ছা মা, আর খাবো না, আইজ থিকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ব। এইসব বাদ…

জুলেখা: হ, এই কথা কতবার বলিছ আগে?  হইয়েছে চল এখন বাড়িতে চলো, ভাত বাইড়্যে রেখেছি।

(কিছুটা দূরে মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটিকে দেখছিল দালাল। তার ওপর জুলেখার চোখ পড়তেই লোকটি পিছন ফিরে অন্যদিকে তাকাতে থাকে।)

জুলেখা: বাবা, যার তার সাতে বেশি মাখপানা কলাম, তাড়াতাড়ি ঘরে আসো। (জুলেখা চলে যায়। দালালটি ধীরে বাবার দিকে এগোতে থাকে। জুলেখা কী ভেবে একবার পিছন ফিরে তাকায়, লোকটি আবারও উল্টো ঘুরে যায়। জুলেখা চলে গেলে দালালটি বাবা’র কাছে এসে বসে। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে আর গোণার ভাণ করে)

দালাল: দুলু কাহা কেমুন আছুইন কইনসে-

বাবা: ওরে আমার নসিবির দোষ। আমিও ফহির হলাম, দ্যাশেও মনান্তার লাইগলো।

দালাল: ট্যাকা লাইগবো দিয়াম, লাইগবো?

বাবা: ধার দিবি? গা-ডা খিচখিচ করতিসে। বেশি না, এক হাজার-

দালাল: তুমি চাইলে ব্যাকগুইন টাকাই দিবার পারি। ধারও না। ফিরত দিওন লাগবো না-

বাবা: কী কচ্ছ? কেম্বায় ?

(কতক্ষণ কথোপকথন চলে। বাবা দালালের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে পকেটে গুঁজে নেয়। এরপর দালাল সেখান থেকে চলে যায়)

দৃশ্য-২

(জুলেখা বাড়িতে তরকারি কাটতে বসে। বাবা একটা বড় ইলিশ নিয়ে এসেছে)

জুলেখা: ও কি, তোমারে সেই কখন ডাকিছি খাবার জন্যি, এত বড় মাছ কই পাইলে? বাবা!

বাবা: ও-ম্যালাদিন হয়্যা গেছে বড় ইলিশ খাই না। তোর মা থাকতি বুঝলি যখন তুই ছোট ছিলি আমাগে দেশে ইস্টিশনের কাছে এক মাছের আড়ৎ ছিল। কি বড় বড় ইলিশ!!! সন্ধ্যা হইয়ে গেলে দাম কইম্যে যেত-

জুলেখা: বাবা আমি জিজ্ঞাসা করেছি মাছ পাইলে কনে?

বাবা: ও ছাড়দিনি, কই আবার পাব! কিন্যেসি। তোর মা যে ইলিশ রাঁইধতো, আর কি বড় বড় ইলিশের ডিম ঝোল দিয়েই দুই থালা খাইয়্যে ফেলতাম।

জুলেখা: ইলিশ কেনার টাকা পালে কনে?

বাবা: মা, তর দাদা সবসময় একটা কথা বইলতো, যদি মজো খানায়, থলে ভরবে আনায়…

জুলেখা: কেমনে বাবা? খাওয়া-দাওয়া বেশি করলে টাকা বাড়ে শুনিনিকো কখনও!

বাবা: মনডারে উদার করলি কাজের নেশা বাড়ে, তখন টাকা আসে খাতি মন চায় সব ভালা লাগে।

জুলেখা: তুমি কিন্তু আমার জিজ্ঞাসা অন্য দিকে নিতেছ বাবা

বাবা: তেমন কিছু না আমি সিদ্ধান্ত নিসি, তুই বিদেশ চইলা যা। ম্যালা টাকা এহন দেয় সৌদি আরবে। সেহানে তর যাওয়া ফাইনাল হইয়ে গেছে। আমারে কিছু টাকাও দিসে। তুই যাওয়ার আগে আরও পঞ্চাশ হাজার দিবে বলসে। (খুব খুশি)

জুলেখা: ও –ঘর বেইচলে বাড়ি বেইচলে, মা মইরল আমারে নিয়ে বস্তিতে আসি উইঠলে এবার আমারেও বেইচে সারিছো

বাবা: এইডা কি কচ্ছিস মা!

জুলেখা: আমি গেলি তো তোমার পরানডা জুড়ায়। তারপর নেশা খাইয়ে পড়ি থাকলি আর ডাকবি ক্যাডা? কখন যাতি হবি তাই কও।

বাবা: মারে আমি সব খোঁজ নিয়েছি। ওরা তর ভিসা হওয়ার আগে সাতদিন ওদের হোস্টেলে রাখবি। তারপর তরে নিয়ে যাবি।

জুলেখা: কিডা বইললো? ওই মালেক দালাল? আপনি শুতি জাগা পায় না, শংকরারে ডাকে। অত ভালো ভালো না বাবা।

বাবা: তুই অত বড্ড চ্যালা করিস ক্যান ক দেখি। যাবি কি না তাই বল। জোর করব না বাপে।

জুলেখা: যাব বাবা, বিদেশেই যাব , তোমার সুখই তো আমার চাই। শুধু মনের দুক্ষ রইলো আমার পড়াশোনা শেষ কইরতে দিলে না। নিশ্চয় ¯^াধীন দেশে একখান চাকরি পাতাম বাবা।

বাবা: তোর কোন মামা খালু আছে ক’ত দেহি! তুই চাকরি পাবি কনে?

জুলেখা: ওসব ভুল কতা বাবা, যোগ্যতা থাকলি দেশেই ম্যালা চাকরি। তা কবে আসপি তোমার মালেক দালাল!

বাবা: কালই আসপার চাইল যে!

 

দৃশ্য-৩

জুলেখা: বাবারে কত টাকা দিয়েছেন? বাকি টাকা বুঝায় দেন

দালাল: ও বিশ হাজার অগ্রিম দিছুইন। আরও ম্যালা দিয়াম। আইজও দিয়াম দশ হাজার, এই ন্যাও গ্যারাই।

জুলেখা: কোন্ দেশে যাব আমি?

দালাল: সৌদি আরব সৌদি আরব, তুমি যেহেতু সুন্দর দুবাইও তোমারে নিতি পারে। যে দেশ তোমারে নিতে পারে তাগের ভাগ্য-

জুলেখা: আমি যাচ্ছি কাজ করতি, আমার রূপে কী আসে যায়?

দালাল: আরে বোঝ না, আরব দেশের সব মাইয়ার সুন্দর। তাই কাজের লোকও ওরা সুন্দর চায়। ব্যাঁকা বুকা চেহারার লোকজন কাজকাম করলি কি রুচি ভালা থাকে কও!

জুলেখা: এখন আমি ক’দিন কোথায় থাকব?

দালাল: এত কথা জানতি নেই। সব ভালো আছে। গেরাই এই ন্যাও, তুমি আরও পাঁচ হাজার রাহো। সাতদিনের মদ্যে তোমার ফেলাইট ফাইনাল।  ও বড় ব্যবসায়ী গেলি দেখবা তার কত দাম।

(সিএনজি চালক চেয়ে চেয়ে দেখে) (সিএনজি রওনা হতে দেখা যায়)

দৃশ্য-৪

(একটা সিএনজি দ্রুত গতিতে চলছে। সিটে বসা জুলেখা ও দালাল)

(দালালের ফোনে একটা রিং বেজে ওঠে)

দালাল: (ফোন ধরে) হ বস আসতেসি। এই সিএনজি থামাও থামাও তো একটু। (নামে সাইডে চলে যাবে। সিএনজিওয়ালা প্র¯্রাব করার ভাণ করে ধীরে ধীরে কাছে ঘেঁষতে থাকে) মাশাল্লাহ বস। খুব সুন্দর! বস বস। না বস আমি নিচে নাইমা আসছি। বস আপনারা আগের ঠিকানাতে নাই? নতুন ঠিকানায় আসছেন? একটু বলেন বস। না না বস মালডারে সিএনজিতে বসাই রাখসি। সে শুনতেসে না। আইচ্ছা সতের বাই তের, আইচ্ছা বনানী না বস? আইচ্ছা ডি ফাইভ বুঝছি বস ফ্যালাট, ফ্যালাট।

(সিএনজিওয়ালা দৌড়ে এসে সিএনজি নিয়ে পালিয়ে যায়। পিছনে দালাল ফোন রেখে চিৎকার করতে থাকে।

দালাল: এই খাড়াও খাড়াও এই পুলিশ, হায় হায় রে কার পাটি কে নিয়া যায় রে-

(সিএনজির ভেতরে জুলেখা চ্যাঁচাতে শুরু করে)

জুলেখা: এই দাঁড়া, এই দাঁড়া তুই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? এই দাঁড়া বদমাশ। এই সিএনজি এই শয়তান লোক। পুলিশ, পুলিশ- পুলিশ বাঁচাও আমাকে বাঁচাও পুলিশ।

(সিএনজিওয়ালা কোনো কথা না বলে সিএনজি টানতে থাকে। সামনে একজন নারী পুলিশ কমিশনার বাঁশি বাজিয়ে সিএনজিকে চ্যালেঞ্জ করে)

পুলিশ কমিশনার: স্টপ, দাঁড়া দাঁড়া বলছি, পালানোর চেষ্টা করলে গুলি করবো।

(সিএনজি দাঁড়ায়)

জুলেখা: আমি একজন লোকের সঙ্গে একটা জায়গায় যাচ্ছিলাম। সেই লোকটি একটু নিচে নেমেছিল। এমন সময় সিএনজিওয়ালা আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। লোকটা একটা দুষ্ট।

পুলিশ কমিশনার: ওহ্ আই সি, ইউ আর নট অ্যা সিএনজি ড্রাইভার, ইউ আরএ কিডন্যাপার, রাইট-

সিএনজি: জে স্যার!

জুলেখা: হ্যাঁ, সে মেয়ে মানুষকে ধরে নিয়ে যায় এটাই তার কাজ-

পুলিশ কমিশনার: এসআই-

এসআই: জ্বি স্যার-

পুলিশ: থানায় নেওয়ার ব্যবস্থা করো-

পুলিশ কমিশনার: স্যার শুধু ড্রাইভার না সিএনজিসহ-

পুলিশ কমিশনার: সিএনজিটা আবার কাকে দিয়ে যাবে? সবকিছু জব্দ করো। আর এই লেডিকে উপযুক্ত অভিভাবকের হেফাজতে ছেড়ে দাও। (পুলিশ কমিশনার হেঁটে সামনে গিয়ে অন্য একটি গাড়ি থামায়)

এস আই: ইয়েস স্যার।

সিএনজি: স্যার বিশ্বাস করেন আমি তাকে বাঁচাতে চাইছি, উনি আমাকে ভুল বুঝছে!

এসআই: হয়, সিএনজিওয়ালাও এখন মানুষ বাঁচানো দায়িত্ব নিয়া নিছ অ্যাঁ। তাইলে মোরা পুলিশ আর আছি কেন!

(সিএনজিতে একজন পুলিশ ওঠে)

সোজা থানায় যা, আমার পুলিশ লইয়া আবার টান দেওয়ার চেষ্টা করবি না। তাইলে কিন্তু গুলি খাইয়া মরবি।

(সিএনজিওয়ালা সিএনজি নিয়ে টান দেয়)

সিএনজি: হায় আল্লাহ যার লাইগা করলাম চুরি সে কইলো চোর দিলো শাস্তি

(ততক্ষণে দৌড়ে কাছে এসেছে দালাল)

দালাল: এইজন্যেই বলি এদেশের পুলিশের মতো মহৎ ও বৃহৎ কোনো জাতি নাই। এসআই সাব আপনি আমার বিরাট উপকার করেছেন। লক্ষ টাকার মামলা।

এসআই: মানে?

দালাল: মানে কিছু না। আপনের এই কষ্টের পুরস্কার¯^রূপ আপনার জন্য সামান্য বকশিশ।

এসআই: মানে সততার পুরস্কার ঘুষ। সততার পুরস্কার আমাকে সরকার দেবে। আপনি যেখানে যাচ্ছিলেন যান।

দালাল: না না না তৌবা তৌবা ! বকশিশ বকশিশ।

এসআই: বকশিশ! তো আমার একার প্রাপ্য না তাইলে ম্যাডামরেও ডাকি-

দালাল: মাশাল্লাহ, ম্যাডামডা অনেক সুন্দর ! সৌদিত যাইবো নাকি? বিরাট দাম!

এসআই: আরে ধূত সৌদিতে যাবে কেন? ওখানে কি ক্রিমিনাল আছে নাকি। স্যার! স্যার! একটু আসবেন স্যার!

(পুলিশের কমিশনার কাছে আসে)

এসআই: স্যার এই ভদ্রলোক আমাদের সততার পুরস্কার¯^রূপ কিছু টাকা দিতে চায়।

পুলিশ কমিশনার:  হুঁ সেটা নিলে তো দুটো নাস্তাও দরকার।

এসআই: বুঝেছি স্যার! এই দাও

(দালাল টাকা দিতে গেলে তাকে ঘুষি মেরে দেয় দুটো। সে পরে গেলে এসি তাকে তুলে এনে বলে)

পুলিশ কমিশনার: তুই যা কিছু করেছিস, আমার এই যে বাটুনটা দেখছিস এটা একটা ক্যামেরা সব রেকর্ড হয়ে গেছে। মানে মানে চলে যা। আমরা একবিংশ শতাব্দীর পুলিশ, তোদের ধারণা পাল্টে দিতে ডিউটি করি। যা ভাগ-

(জুলেখা ও দালালকে চলে যেতে দেখা যায়)

দৃশ্য: ৫

জুলেখাকে দু’হাত দু’দিকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। চোখ কালো কাপড় দিয়ে বাঁধা। ভিতর থেকে তাকে আনা হয়।

(একটা গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামে একজন সানগ্লাস পরা লোক। লোকটিকে শুধু পিছন থেকে দেখানো হয়। সামনে একবার দেখানো হয়। মুখটা একবার, একবার সানগ্লাসটা একবার বডিটা। পকেট থেকে একটা টাকার বান্ডিল বের করে টেবিলের ওপর রাখে।

গ্যাংস্টার: এবারের মালটা খাসা আছে স্যার! দামটা একটু বেশি লাগবে।

মুক্তিযোগ: (আরও একটা বান্ডিল বের করে দেয়) আরও দশ হাজার বাড়িয়ে দিলাম। ভিতরে আর কেউ আছে নাকি!

গ্যাংস্টার: আজ আর কেউ নেই। দু’জনকে আজই সৌদি পার করে দিয়েছি। বাজার ভালো না। আপনাদের মতো দেশি বাজারই ভালো।

মুক্তিযোগ: হুঁম্ গাড়িতে তুলে দাও। নতুন কিছু এলেই আমাকে জানাবে।

(গাড়িতে মেয়েটিকে তুলে দেয় দু’জন দালাল। সামনের সিটে বসে মুক্তিযোগ)

 

দৃশ্য-৬

(থানার হাজতে সিএনজিওয়ালাকে খুব পিটানো হচ্ছে।)

এসআই: বল, তোর গ্যাংলিডার কে? বল

সিএনজি: সত্যিই স্যার আমি ওই মহিলাকে কেবল বাঁচাইতে চাইসিলাম

এসআই: বাঁচাইতে চাইসিলি! হারামজাদা, সুন্দরী মেয়ে দেখলে মাথা ঠিক থাকে না!। কোথায় নিয়া কী কাণ্ড ঘটাইতি সারাদেশ তোলপাড় হইয়া যাইতো! ভাগ্য ভালো জেন্দা মাইয়ারে উদ্ধার করসি, মইরা গেলে কী হইতো আমার। সারা জীবনের প্রমোশন শেষ! চাকরি নিয়া টানাটানি

সিএনজি: (খুব জোরে চিৎকার করে) থামেন! আমাকে আর মারবেন না। আমি দুষ্ট লোক না, আমার বউ বাচ্চা কাল থেকে আমার সংবাদ জানে না! ওরা কী খাচ্ছে কী করতেসে কিচ্ছু জানি না স্যার। ম্যাডাম বিশ্বাস করেন আমি ওই মহিলারে নিয়া পালাইতে চাইনাই। তারে আমি বাঁচাইতে চাইসি। আপনারা খোঁজ নিয়া দেখেন সে শয়তান লোকদের খপ্পড়ে পইড়া গেসে। এতক্ষণে তার সর্বনাশ হইয়া গেসে। ম্যাডাম, একটু বোঝার চেষ্টা করেন-

পুলিশ কমিশনার:  এসআই, তাকে এখানে নিয়ে আসো। আমার মনে হচ্ছে ঘটনাটা অন্যরকম!

(সিএনজিওয়ালাকে নিয়ে আসা হয়, কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের একটা টহল গাড়ি ছুটতে দেখা যায়)

 

 

দৃশ্য-৭

(মুক্তিযোগের বাড়ি।)

জুলেখা: আপনি একজন মানুষ! আপনার বয়স আমার বাবার চেয়েও বেশি। আপনার লজ্জা করে না আমার মতো ছোট ছোট মেয়েদের ধরে এনে গণিকা বানাতে

মুক্তিযোগ: (শুধু পেছনটা দেখা যায়) হা হা হা-। এটা আমার নেশা! আমার লজ্জা করে, লজ্জা করে তোমার মতো মেয়ে ধরে আনতে। সেজন্য আমি চেহারা দেখাই না। শুধু কাজ করে যাই।

জুলেখা: কাজ, নিকৃষ্ট কাজ! জঘন্য কাজ! একাজের কী শাস্তি আপনি জানেন না।

মুক্তিযোগ: হা হা হা! আমার শাস্তি আমি জানি। তবে আমি তোমাকে এখানে মাত্র এক রাত রাখবো। তারপর ছেড়ে দেবো।

জুলেখা: একজন নারীর চরিত্র কলঙ্কিত হতে একরাত কেন একটি ঘণ্টাই যথেষ্ট! আপনি কি তার মূল্য বুঝবেন। আমার ধারণা আপনার স্ত্রীও নেই, মেয়েও নেই। থাকলে আমার দিকে নজর দিতে পারতেন না।

মুক্তিযোগ: দেখো মেয়ে, জ্ঞানের কথায় আমার কান টলে না। আমার বয়স বাংলাদেশের চেয়েও বেশি, তুমি তো তুচ্ছ। এখানে কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার আসবে। এরপর আমি তোমার কাছে আবার আসব। হা হা হা-

(জুলেখা কিছু খায় না! আতঙ্কে এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করে। এরপর শুয়ে থাকে। দেখতে পায় লোকটি হায়েনার মতো তাকে ভোগ করতে এগিয়ে আসছে। সে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। দেখে দরজা খোলা। সে বাইরে বেরিয়ে যায়। নিচে নেমে পালাতে চায়। দেখে বুড়োটা দৈত্যের মতো সামনে বসে আছে।)

মুক্তিযোগ: হা হা হা ! রাত তো শেষ হয়নি বেবি। সকাল হোক।

জুলেখা: আপনি আসলে কে! আপনার চোখ আমি দেখিনি। কিন্তু আপনার চোখ না দেখলেও আপনার দেহ দেখছি, আপনাকে আমার অন্য একজন মানুষ মনে হচ্ছে। আপনার নাম কী?

মুক্তিযোগ: আমার নাম মুক্তিযোগ!

জুলেখা: মুক্তিযোগ? এটা কোনো নাম হতে পারে?

মুক্তিযোগ: হা হা হা! এটা আমার ছদ্মনাম। অন্য একটা নাম আছে সেটা ১৯৭১ সালের পর বিসর্জন দিয়েছি।

জুলেখা: আপনি মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযোগ: সেজন্যই তো আমার এই নাম!

জুলেখা: তাহলে এখন আপনি এই পেশায় কেন?

মুক্তিযোগ: এটা আমার পেশা নয়। আমার শ’মিলের ব্যবসা আছে। স্ত্রী ও এক কন্যাকে মুক্তিযুদ্ধে সঁপে দিয়েছিলাম। ওদের ফিরে পাইনি। পাকিস্তানি লম্পটেরা ছিঁড়ে খেয়ে মেরে ফেলে গেছে। তারপর থেকেই আমি পাগল। এখন ব্যবসায় থেকে যা আয় করি তোমার মতো বন্দি মেয়েদের কিনে আনি, আর এক রাত রেখে ছেড়ে দিই।

জুলেখা: কিন্তু আপনি তো আমার কোনো সম্ভ্রমহানি করলেন না!

মুক্তিযোগ: আমি তো মুক্তিযোদ্ধা! মুক্তিতে নিত্যনতুন যোগ করাই আমার কাজ! সেটাই করার চেষ্টা করছি। আমার স্ত্রীমেয়ে পরাধীন দেশে বাঁচতে পারেনি। তুমি চিন্তা করো না! এটা ¯^াধীন দেশ। তুমি বাঁচবে আত্মসম্ভ্রম নিয়ে বাঁচবে। কাল সকালে তুমি চলে যাবে তোমার আপন ভুবনে।

জুলেখা: মুক্তিযোগ! কি চমৎকার নাম আপনার, কী মহৎ আপনার পেশা! বাবা! আপনি যে আমার মতো অসহায় মেয়েদের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে এসেছেন। মুক্তিযোগ!

(পুলিশ দালাল ও গ্যাংস্টারসহ এবাড়িতে আসে। মাইর খেয়ে  তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে আসে)

এসি: অবশেষে আপনি ধরা পড়লেন। নারী পাচারকারীদের এই গডফাদারকেই তো আমরা খুঁজছিলাম।

এসআই: লোকটার বয়স কতো! কিন্তু কী কঠিন ব্যবসাটাই না করে। চলুন। এই বুড়াকে হ্যা›ডকাফ পরাও। বুড়ো বয়সে ভীমরতির মজা বোঝাবো শালা থানায় চল।

জুলেখা: না! আবার একটা বড় ভুল হতে যাচ্ছে পুলিশের। আমিই সেদিন বুঝতে পারিনি আমি নিজেই কিডন্যাপ হয়ে গেছি। ফেঁসে গেছি দালালের ফাঁদে।

(কতক্ষণ কী বলাবলি করে শোনা যাবে না।)

এসি: স্যরি, আমরা বুঝতে পারিনি। আমি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ করার পর এখনও দেশের জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এরকম অসহায় নারীদের টাকা দিয়ে কিনে এনে মুক্তি দিচ্ছেন। দেশের নারীদের মুক্তির জন্য জন্য আপনি লড়ে যাচ্ছেন নিরন্তর। আপনি মুক্তিযোগ করছেন। কিন্তু আপনি পুলিশের সহায়তা চাইলে আপনাকে এত টাকা খরচ করতে হতো না। এই গ্যাংস্টাররা আগেই ধরা পড়তো।

পুলিশ: পুলিশের সাহায্য আমি দুটি কারণে চাইনি কমিশনার! প্রথমত আমি ভরসা করতে পারিনি পুলিশ এই গ্যাংস্টারের শিকড় উপড়ানোর চেষ্টা করবে। দ্বিতীয়ত, এতবড় গ্যাংস্টার ধরার জন্য আমি কোনো তথ্য কোথাও দিয়েছি এটা অপরাধীরা জানতে পারলে আমার নিজের জীবন বিপন্ন হতো।

 

 

 

  • Prev Post
  • Next Post

LeaveComment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »