কাকতাড়ুয়া
সেলিনা হোসেন
নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ
প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম
চরিত্র পরিচিতি
বুধা-১৩ বছর
চাচি-৪০ বছর
নোলক বুয়া-৪৫ বছর
জয়নাল-৫০ বছর
হাশেম- ৫০ বছর
কুন্তি-১২ বছর
ফুলকলি-১২ বছর
আলি-২২ বছর
মিঠু-২২ বছর
হাবিব-২২ বছর
গোবর বুড়ি (বুড়ি)
হরি কাকু (বুড়া)
হরিকাকুর স্ত্রী (বুড়ি)
মিঠুর মা- ৫০ বছর
শাহাবুদ্দিন- ৪০ বছর
মতিউর-২২ বছর
রানী-১৩ বছর
ফজু মিয়া- ৫০ বছর
কুদ্দুস (রাজাকার-১)- ৫০ বছর
রাজাকার-২ – ৪০ বছর
রাজাকার-৩ – ৪০ বছর
তিনু (বুধার বোন, মারা যায়, দেড় বছর)
শিলু, তালেব (বুধার ভাই, তিন বছর, পাঁচ বছর; মারা যায়)
গান: কাকতাড়–য়া
লালকমলের রক্ত চোখে কাকতাড়–য়া ধায়
শকুনগুলো ভয় পেয়ে সব আড়ে আড়ে চায়…
বিপদ বলো, মরণ বলো কেউ কি তাকে পায়?
লালকমলের রক্ত চোখে কাকতাড়–য়া ধায়
শকুনগুলো চেয়ে থাকে মানুষ মরার আশে
কাকতাড়–য়া ধেয়ে আসে সর্বনাশের ত্রাসে
সুখে বলো, দুখে বলে সে-ইতো ছুটে যায়
লালকমলের রক্ত চোখে কাকতাড়–য়া ধায়
গান গায় সে ভেবে ভেবে বুধা তাহার নাম
কাকতাড়–য়া সেজে থাকে বাঁচে যদি গ্রাম
যুদ্ধ বলো, শান্তি বলো তাকেই সবাই পায়
লালকমলের রক্ত চোখে কাকতাড়–য়া ধায়
বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে দিয়েছে যে ডাক
মুক্তির চোখ লাল হয় তার শুনে সেই ডাক
পাকবাহিনী ভীরু চোখে মুক্তিযোদ্ধা চায়…
লালকমলের রক্ত চোখে কাকতাড়–য়া ধায়
গীতিকার: ড. মো. হারুনুর রশীদ
দৃশ্য: এক
হাশেম : কোথায় যাচ্ছিস বুধা?
বুধা: সোনার ঘরে।
হাশেম: সেটা কী?
(হাত উল্টে পথ বাড়ায় বুধা)
বুধ: (¯^গত) যার ঘর নেই তার চারদিকে তো সোনার ঘরই থাকে। এটা কি বলে দিতে হবে? মাঝে মাঝে লোকজন এমন বোকার মতো প্রশ্ন করে হাসি পায়।
(গান তার খুব ভালো লাগে। সে আখড়া গান পছন্দ করে। যার ভেতরে গান থাকে সে খুব ভালো মানুষ হয়।)
(বুড়ো শামুকের খোল বুড়ো আঙুলের মাথায় তুলে নাচায়। নাচাতে নাচাতে ও ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে। শামুকেরর খোলটা বুড়ো আঙুলে টুপির মতো লাগে। লোহার টুপি। খান সেনাদের টুপি দেখতে পায়)
(কারও কামলা খাটে, গরু চড়ায়, মোট বয়।)
জয়নাল : ও পাগল হয়নি। জমে যাওয়া শক্ত পাগল যাকে বলে।
ফজু : চোখের সামনে মা-বাবা, চার ভাই বোনকে মরে যেতে দেখলে কেউ কি নরম থাকে? নাকি থাকতে পারে। আমরা ওকে পাগল বলি। আসলে ওতো একটা শক্ত বালক হয়েছে।
বুধা: (¯^গত) কীভাবে বেঁচে গেলাম সেবারের কলেরা রোগে। সেই মৃত্যু এবং অন্ধকারের কথা ভাবলে আমার আর কোনো ভয় থাকে না।
দৃশ্য-২
(সারা গ্রামে কলেরা রোগ। গভীর রাতে ¯^প্ন ভেসে ওঠে। গভীর অন্ধকারে এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে মৃত্যুর কান্না ভেসে আসে বজ্রপাতে মতো। ওর বাবার শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে স্থির হয়ে যায় চোখের মণি। ঘরে একটি মাত্র কুপি। ফুরিয়ে আসছে তেল। কুপি নিয়ে একপাশে দেখতে পায় এক পাশে পড়ে আছে মা। তার বুকে ছোট তিনু। তিনুর বয়স দেড় বছর। তিনুর গায়ে হাত দেয় বলে। চমকে উঠে বলে-)
বুধা: ‘তিনু! আমার কোলে আয় বোন। তুই না আমার কোলে উঠতে ভালোবাসিস। ঘুমপাড়ানি গান শোনাবো আয়। মায়ের কোলে কেন ঘুমাচ্ছিস আজ?
অন্য ঘরে যায়। দেখতে পায় অন্য পাশে মেঝেতে গড়াচ্ছে শিলু আর তালেব। ভোর হতে হতে মারা যায় বিনু। সকাল হলে সে কারও কারও হাত-পা নেড়ে দেখে শক্ত হয়ে জমে গেছে। হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে। চোখ থেমে আসে)
দৃশ্য-৩
(মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুহাত সোজা করে জামাটা মাথায় বেঁধে কাকতাড়–য়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা বোলতা উড়ে যায় বোঁ বোঁ করে। ওর মনে হলো চাচি ডাকছে।)
চাচি: বুধা বুধা। পান্তা দুগা খেয়ে যা। শিগগির আয় বলছি। ওখানে দাঁড়িয়ে কী কচ্ছিস? কাকতাড়–য়া হয়েছিস না?
(বুধা পান্তা খেতে বসে। পাশেই বসা কুন্তি। ও চেয়ে চেয়ে বুধার খাওয়া দেখে)
বুধা: চাচি, শুধু মরিচ পুড়িয়ে পান্তাভাত দিয়েছ?
চাচি: ওটাই বা কোথায় পাই! রোজ রোজ কেবল ভাত গেলা। ঢ্যাঙা তো কম হসনি। কামাই করতে পারিস না বাপু?
বুধা: (¯^গত) কামাই! (ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করে) কামাই!
চাচি: তোর মা-বাপ তো মরে খালাস। এখন জ্বালা আমার। পরের ছেলের বোঝা টানতে পারি না বাপু।
বুধা: (¯^গত) বোঝা! (ভাত নাড়াচাড়া করে) বোঝা! (ভাবতে থাকে)
চাচি: শোন্ বুধা, তুই তো দেখতেই পাস যে তোর চাচার রোজগার নেই। তোর আটজন চাচাতো ভাইবোন, দিন চলে না।
(বুধা নীরবে ভাত খায়। পোড়া মরিচ ডলে ডলে ভাত লাল করে ফেলেছে। দ্রুত ভাত খায়। ভাতের দলা গলা দিয়ে নামে। চোখে পানি আসে কিন্তু গড়ায় না)
চাচি: কিরে কথা বলছিস না যে?
বুধা: আমি কামাই করব।
(চাচির চোখ উজ্জ্বল হয়)
চাচি: সত্যি কামাই করবি?
বুধা: নিজের বোঝা নিজে বইব।
চাচি: সত্যি? তাহলে তুই আমাকে মুক্তি দিবি?
বুধা: হ্যাঁ, সত্যি। (¯^গত) মুক্তি! মুক্তি! (শব্দটি তার মনে কম্পন জাগায়। গলায় ভাগ আটকে গেলে জোরে জোরে কাশতে থাকে। চাচি ওকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়)
চাচি: পানি খা বাপু। এত অল্পে কেন যে তোর চোখ লাল হয়ে যায়। ছোটবেলায় তুই খুব ল²ী ছেলে ছিলি। একদম মায়ের নেওটা। একরাতে মানুষগুলো মরে যাওয়ার পর তুই যে কেমন হয়ে গেলি! কিছু হলেই তোর চোখ লাল হয়ে যায়।
বুধা: সত্যি আমার চোখ লাল হয়ে যায়?
চাচি: হ্যাঁ, রে সত্যি। একটুও মিছে বলছি না।
বুধা: আমি ভেবেছিলাম আমার চোখটা পাথরের মতো হয়ে গেছে। কিছু দেখতে পাই না চাচি।
চাচি: না রে না, সে যে কেমন লাল তোকে আমি বোঝাতে পারব না। তখন তোকে দেখলে আমার সালাম করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় তুই আমার মুরুব্বি। হয় আমার বাবা, না হয় চাচা।
বুধা: কেন যে আমাকে লজ্জা দেন চাচি।
চাচি: তোকে লজ্জা দিতে চাই না রে। আমার কি সাধ্য যেÑ
(কথা শেষ করতে পারে না। আঁচলে চোখ মোছে। রান্নাঘরের দরজায় বসে গুনগুনিয়ে কাঁদে। বুধা সে কান্না শুনতে পায় না। সেদিকে ওর খেয়াল নেই। খুশি খুশি ভাব। ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসে)
(বুধার কল্পনায় আসে চাচির সঙ্গে দেখা করতে গেছে। চাচি আঁচল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে। চাচি গ্লাস হাতে চলে যায় পানি আনতে। চাচাত ভাইবোনগুলো তাকে ঘিরে ধরেছে। ভাইবোনদের সঙ্গে ফলপাকুড় ভাগ করছে। একজন বোন গুড়-মুড়ি এনে দেয়। একটু খেয়ে ভাই- বোনদের দিকে এগিয়ে দেয়। কুন্তি তাকিয়ে থাকে। বুধা উঠে বেরিয়ে যায়। কুন্তিও কাঁদতে কাঁদতে পেছন পেছন বেরিয়ে আসে।)
বুধা: (¯^গত) আচ্ছা, সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া মানে কি মুক্তি? তবে আজ থেকে আর চাচির সঙ্গে সম্পর্ক কাটাকাটি। সম্পর্ক কি ভাঙা যায়? (উত্তর পায় না যেন) বাবা মরে গেলে চাচি কি পর হয়ে যায়? তবে কুন্তির সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?
কুন্তি: (ছলছল চোখে) তুমি যেয়ো না, বুধা ভাই।
বুধা: (অদ্ভুতভাবে ফিরে তাকায়। সম্পর্ক কী এটা যেন ভাবে।) কুন্তিÑ
কুন্তি: (হাত ধরে বলে) বুধা ভাই, তুমি যেয়ো না।
বুধা: যাব না।
কুন্তি: হ্যাঁ, যেয়ো না।
বুধা: কেন?
কুন্তি: তুমি চলে গেলে আমার খুব খারাপ লাগবে।
বুধা: খারাপ লাগবে? কেন?
কুন্তি: (ভিন্ন ¯^রে) জা-নি- না। (ভিন্ন ¯^রে কাঁদে)
বুধা: (কুন্তির মাথায় হাত বুলিয়ে) আজ যাই। আর একদিন আসব।
কুন্তি: কবে আসবে?
বুধা: গাঁয়েই তো থাকব। যখন মন চাইবে তখন আসব।
কুন্তি: এটা কি আসা হলো?
বুধা: এটা আসা হলো না?
কুন্তি: না, একটুও ভালো আসা না।
বুধা: ভালো আসা কী, আমি তো জানি না কুন্তি। (খুশি হয়ে) ঠিক আছে, আমি একদিন ভীষণ ভালোভাবে আসব।
কুন্তি : কবে? (খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে) কবে আসবে বুধা ভাই?
বুধা: তোর বিয়ের সময়।
কুন্তি: বিয়ে? আমার তো বিয়ে হবে না। বড় বুয়াদেরই তো বিয়ে হয়নি। আমাকে কে বিয়ে করবে?
বুধা: করবে, করবে। দেখবি লাল টুকটুকে বর আসবে।
কুন্তি: তোমার মতো?
বুধা: ধুৎ বোকা। আমার মতো হবে কেন? আমি কি একটা ছেলে হলাম? আমি তো এখন পথের ছেলে। এতিম। অনেক সুন্দর, অনেক ভালো বর পাবি তুই।
কুন্তি: (চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ে) তোমার মতো কেউ ভালো নয়।
বুধা: আমি যাই রে কুন্তি। তুই বাড়ি যা। চাচি দেখলে তোকে বকবে। আমি চাই না আমার জন্য তোকে বকা খেতে হোক।
(কুন্তি পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদে। ছেলেটি পেছনে তাকায় না)
বুধা: (ভাবতে ভাবতে চলে যায়। ¯^গত) আমার মতো কেউ ভালো নয়? আমি যদি এতোই ভালো, তবে চাচি কেন আমায় সইতে পারল না। তাহলে সম্পর্কটা কি এমন কারও কাছে ভালো কারও কাছে খারাপ?
দৃশ্য-৪
(মাঠের মাঝখানে কাকতাড়–য়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কাঠফাটা রোদে শকুনের ছায়া দেখা যায়। তালগাছের ওপর থেকে সাঁই করে উড়ে আসে একটা শকুন। ধীরে ধীরে কাকতাড়–য়া রূপ ছেড়ে মাঠের মাঝের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়)
আলি : কিরে কাকতাড়–য়া গায়ে রোদের রং মেখে এলি?
(বুধা জবাব না দিয়ে হেঁটে যায়। নোলক বুয়া খড়ি কুড়িয়ে ফিরছিল)
নোলক বুয়া: কি রে ছন্নছাড়া কোনো কাজ পেলি?
বুধা: এই যে কাজ পেয়েছি নোলক বুয়া- (ছন্নছাড়ার মতো হাঁটার চেষ্টা করে)
(পুকুরে জাল দিয়ে মাছ ধরছিল কিছু মানুুষ। হরিকাকুর জালে প্রচুর মাছ ওঠে। ফোকলা দাঁতে হেসে বলে)
হরিকাকু: ওরে ওমানিকরতন। দুটো মাছ নিবি নাকি? রেঁধে খাবি খন। হে হে হে।
বুধা: কাকিমাকে রাঁধতে বলো হরিকাকু। মাঝরাতে এসে খেয়ে যাবো।
হরিকাকু: বলিস কিরে তুই কি ভূত নাকিরে মানিকরতন। (ভদ্রলোকের মতো হেঁটে যায়)
(বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরছে দুজন মানুষ। পেছনে বুধা ধানখেতের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যায়। সামনের দুজন মানুষ জয়নাল চাচা ও হাশেম মিয়া)
বুধা: এবার ধান বেশ ভালো হলো গো জয়নাল চাচা।
জয়নাল: হ্যাঁ রে সোনা বাবা। দ্যাখ দ্যাখ ধানের রংগুলো হয়েছে তোর গায়ের রঙের মতো। এজন্যই তো তোকে সোনা বাবা বলি।
(গোবর কুড়ানি বুড়িটা হেঁটে আসছে)
বুধা: কি গো গোবর বুড়ি? রাত হয়ে এলো যে, কালির ভ‚তে নিয়ে যাবে মাইরি।
বুড়ি: তুই থাকতে আমার আর চিন্তা কিরে গোবর রাজা।
বুধা: তুমি আমায় ও নামে কেন ডাকো গোবরের আবার রাজা হয়, গোবর বুড়ি হয়।
বুড়ি: কতদিন আমাকে গোবর কুড়িয়ে দিয়েছিস। তুই ছাড়া আমার রাজা কে বল?
জয়নাল: ও গোবর বুড়ি, বাড়িতে কিছু ল্যাদালাঠি দিয়ে যেও, বুঝলেÑ-
(অনেকক্ষণ হাঁটে। কেউ কথা বলে না।)
হাশেম: খোকন বাবু, আজ তুই আমার বাড়িতে ভাত খাবি। আজ অনেক সওদা করেছি, বুঝেছিস?
বুধা: আজ আখড়ার গান শুনতে যাব হাশেম কাকা। তুমি যাবে না?
হাশেম: না – রে রাতে জাগতে পারি না।
বুধা: (হাঁটতে হাঁটতে ভাবে।) (¯^গত) যার যা খুশি সে নামেই আমাকে ডাকুক। অনেক নাম থাকলে অনেক রকমের মানুষ হওয়া যায়। আমি হতে চাই কুন্তির চিন্তার মতো ভালো, নোলক বুয়ার ভাবনার মতো সাহসী, চাচির কথার মতো লাল চোখের মানুষ, হরিকাকুর চোখে দেখার মতো শক্তিশালী। আরও হতে চাই বিশ্বাসী, পরোপকারী সবকিছু। আমি তাহলে অনেকগুলো মানুষ। (মাঠ পেরিয়ে, ঘাট পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে ছুটতে থাকে) চাচি, আমি একজন ¯^াধীন মানুষ হতে চাই। কী মজা ¯^াধীন মানুষ! ¯^াধীন মানুষ। (ততক্ষণ ও বাজারে এসে পড়েছে)
দোকানদার: (ভ্রæ কুচকে) কী বলছিসরে বুধা?
বুধা: ¯^াধীনতা
মিঠু : ¯^াধীনতা? দূর বোকা।
বুধা: (ঘাড় বাঁকিয়ে) ¯^াধীনতা ভীষণ আনন্দের। ¯^াধীনতা খুব দরকার। আমি তো এখন ¯^াধীন মানুষ।
মিঠু: (নিজের কাজে মন দিতে দিতে) ছেলেটার পাগলামি গেল না।
দৃশ্য-৫
(মিলিটারি গ্রামে জিপে করে প্রবেশ করে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে। বুটের শব্দ চড়চড় শব্দে ফোটে। বড় সড়কের মাথা বরাবর মিলিটারি ঝপঝপিয়ে নামে। ও ওদের বাজারের দিকে ছুটে যেতে দেখে। বুধা ধানগাছের আড়ালে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে। ওর মাথার ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যায় মিলিটারি। পরক্ষণে ভেসে আসে মানুষের চিৎকার আর্তনাদ। ও দেখতে পায় বাজারটায় আগুন লেগেছে। মিলিটারি চলে যাওয়ার পর ও বাজারের সামনে ছুটে এসে দাঁড়ায়। কেউ আগুনে পুড়ে, নয় গুলি খেয়ে মরেছে। অনেকে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে। ও নিজে একটা মাটির হাঁড়ি নিয়ে ডোবা থেকে পানি আনে। পানি আনতে আনতে ও ফুঁসতে থাকে। বাজারের দিকে তাকিয়ে চোখ লাল হতে থাকে।)
রাজাকার-২ : কী হয়েছে, বুধা?
বুধা: কিছু না।
রাজাকার-২ : আগুনের ধোঁয়ায় তোর চোখ লাল হয়ে গেছে।
বুধা: আমার কিছু হয়নি।
রাজাকার-২ : আমার সঙ্গে চল আমার বাড়িতে থাকবি।
রাজাকার-২: না, আমি এই বাজারে থাকব। আধা পোড়া ঘরের ছাদের নিচে আমি ঘুমাতে পারব।
রাজাকার-২: (হা করে মুখ ভেংচিয়ে) তুই মানুষ হবি না।
বুধা: মানুষ হব না, মানুষ হব না (ছুটে দৌড় দেয়। নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। নদীর কুলকুল ধ্বনি কান পেতে শোনে। জলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।)
দৃশ্য-৬
(অনেক লোক ঘর বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। ও প্রথমে নোলক বুয়ার বাড়ি ছুটে যায়। নোলক বুয়া বাঁধা-ছাঁদা শেষ করেছে। বুধা অবাক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। মাটির হাঁড়ি উল্টে পড়ে ভেঙে আছে। মুড়ির টিনগুলো ঘরের চালায় ঝুলছে। বেরোনোর আগে নোলক বুয়া ওকে জড়িয়ে ধরে)
নোলক বুয়া: ছন্নছাড়া, আমার সঙ্গে চল।
বুধা: কোথায় নোলক বুয়া?
নোলক বুয়া: যেদিকে দুচোখ যায়। কোথাও না কোথাও একটা আশ্রয় তো জুটবে।
বুধা: কিন্তু কেন যাব?
নোলক বুয়া: (অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে) এখন কি জিজ্ঞেস করার সময়? প্রশ্ন করছিস যে? দেখলি না কত কি ঘটে গেল? ওরা তো আবার আসবে। তখন যাকে পাবে তাকে মারবে। আমরা কেউ বাঁচব না।
বুধা: সবাই গেলে গাঁয়ে কে থাকবে?
নোলক বুয়া: শোনো ছেলের কথা! এখন কি এত কথা বলার সময় আছে? তোর হয়েছে কি বলতো? বাপ-মা ভাই- বোন সব তো গেছে। এখন কি তোর নিজের যাওয়ার শখ হয়েছে?
(নোলক বুয়া নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। ও নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে।)
বুধা: (¯^গত) কেউ না থাকলে গ্রামে একাই থাকব। কেন পালাব? যে পালায় সে ভীতু। বোকা। সবার উচিত গায়ে থেকে লড়াই করা। লড়াই! লড়াই! (বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করে।) অনেককে দেখতে পায় পথ দিয়ে পালাচ্ছে।
(হরিকাকু বুড়ি স্ত্রী নিয়ে অনেক কষ্টে যাচ্ছে। স্ত্রী ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। বুধাকে দেখে বুড়ি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে)
বুড়ি: দেখ তো মানিকরতন, এই বয়সে কেউ কি বাড়িঘর ছেড়ে বেরোতে পারে?
বুধা: কেঁদো না, কাকি। পালাও। তোমাদের বাঁচতে হবে তো। তুমি তো লড়াই করতে পারবে না। শুধু শুধু ওদের হাতে মরবে কেন? তোমার বোঝা আমাকে দাও কাকু। আমি তোমাকে খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়ে আসি।
হরিকাকু: এগিয়ে দিবি কেন? মানিকরতন, তুই আমার সঙ্গে চল। তোকে গাঁয়ে রেখে যেতে আমার মন চায় না রে।
বুধা: তোমার সঙ্গে আমি যাব? গাঁয়ে থাকবে কে? তোমার ভিটে দেখবে কে? চলো তোমাকে খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়ে আসি। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বেলা বাড়লে রোদে তোমাদের কষ্ট হবে। আমি তো চাই যে তোমাদের যেন কষ্ট না হয়। (হরিকাকু ওর মাথায় বোঝা দিয়ে সোজা হাঁটে। বড় সড়কের কাছে আসে)
হরি কাকু: এবার তুই যা। এখন আমি পারব। ফিরে এসে তোর সঙ্গে আমার দেখা তো মানিক রতন?
বুধা: হবে গো হবে। ভাবছ কেন? (বুধা হরিকাকুর চলে যাওয়া দেখে) (¯^গত) কত বয়স হলো হরিকাকুর? হেঁটে যেতে পারবে তো? নাকি পথের ধারে মরে পড়ে থাকবে। তখন কে আমাকে মানিকরতন ডাকবে? (বুধার চোখ ভিজে ওঠে)
(রানীর পুরো পরিবার চলে যাচ্ছে।)
রানী: (ভয়জড়ানো কণ্ঠে) যাচ্ছি রে, কাকতাড়–য়া।
বুধা: যা, ফিরে এলে দেখা হবে। ঠিকমতো যাস। ভয় পাস না।
রানী: তুই কিন্তু আর কাকতাড়–য়া খেলা করিসনে। মিলিটারি গুলি করতে পারে। দুষ্টুমি করিস না কাকতাড়–য়া। তোকে নিয়ে আমার ভীষণ ভয় হয়। তুই যে কী ঘটিয়ে ফেলবি কে জানে?
বুধা: আমাকে নিয়ে তোর এত ভাবতে হবে না। তুই তোর পথে যা। তুই তো একটা ভীতুর ডিম। সেজন্য পালাচ্ছিস। আমি পালাব না। লড়াই করব।
রানী: লড়াই করবি?
বুধা: হ্যাঁ, লড়াই, লড়াই। যা, যা ভাগ।
রানী: (বিস্ময়ে) ইস কত বাহাদুর, যেন বীর! লড়াই করবে? সেদিনের ছোঁড়া, ঢঙ কত!
(বুধা হাসতে হাসতে পা বাড়ায়)
বুধা: (¯^গত) সবাই তো চলে যাচ্ছে। আমি এখন কোথায় যাব? চাচা কাজ খুঁজতে শহরে গেছে ছয় মাস আগে ফিরল না। আর চাচিও তো ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে। চাচি এলেই বা ওবাড়িতে কেন যাব? কুন্তি ছাড়া কেউ আমায় ভালোবাসে না।
দৃশ্য-৭
(বেশ কিছুদিন পর নতুন সূর্যোদয় দেখা যায়। গায়ে বেশ কলরব। এর মধ্যে গায়ে মিলিটারি এসে ক্যাম্প বানিয়েছে। রাইফেল হাতে মিলিটারিদের ডিউটি করতে দেখা যায়। বুধা দাঁড়িয়ে দেখছে। ওরা কী বলাবলি করছে উর্দুতে।)
বুধা: (¯^গত) ওরা কোন দেশের মানুষ! ওদের ভাষা বুঝি না কেন? (একটা বোলতা উড়ে যায় বোঁ বোঁ শব্দ করে। কিছুটা বিরক্ত হতে দেখা যায় বুধাকে। এমন সময় বাজারের পোড়ার আওয়াজ ওর কানে ভেসে আসে। ফটফট করে বাঁশ ফোটে। একটা করে গুলি একেক করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল তিনজন মানুষ। ধানগাছের আড়ালে সে থরথর করে কাঁপে। কবর দেওয়ার দৃশ্যটা ভেসে ওঠে কল্পনায়।)
হাবিব: (কাঁদতে কাঁদতে) এই গাঁয়ে একটা গণকবর হবে আমরা কি কোনোদিন ভাবতে পেরেছিলাম।
বুধা: গণকবর কী হাবিব ভাই?
হাবিব: এই যে একসঙ্গে সবাইকে গাদানো।
(‘গাদানো’ শব্দটা বলে গুমরে ওঠে বুধা)
বুধা: (দাঁতে দাঁতে কামড়ে) প্রতিশোধ! জ্যন্ত ফিরে যাবি না। একবার কলেরা এসে গাঁয়ের অনেক মানুষকে নিয়ে গেলে। এবার এসেছে ভিন্ন রকমের উৎপাত। ভিনদেশী মানুষের উৎপাত! ছাড়ব কেন! (চোখ লাল হয়ে যায় বুধার)
দৃশ্য-৮
(বাজারে আসে বুধা। একটা পুরোনো ঘরে ছাই-কয়লা সরিয়ে জায়গা করে নেয়। পাশে পড়ে থাকা একটা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে। চিত হয়ে শুয়ে থাকে কাকতাড়–য়ার মতো-। শিস বাজাতে বাজাতে ঘুমিয়ে যায়। অনেক রাত। শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। রাতে সেই বাজার পোড়ার ¯^প্ন দেখে। আর্মিরা দৌড়া দৌড়ি করে। সে ‘দাঁড়াও’ বলে সে আচম্বিৎ জেগে ওঠে। )
বুধা: (¯^গত) উফ্ । ¯^প্নটা কেন সত্যি হলো না! একটা ঘুষিও কি তোমাদের পাওনা হয়নি? তোমরা যারা আমাদের ঘর পোড়ালে, বাজার পোড়ালে, মানুষ মারলে, গাঁয়ে গণকবর বানালে, লোকজনকে বাড়িঘর ছাড়ালে, তোমরা কি এমনি এমনি চলে যাবে? আমরা কি এতই দুর্বল? কলেরা আমাকে খেতে পারেনি। আমি তোমাদের জন্য বেঁচে আছি। (বুধা দোকানের চালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়) তবে কি বঙ্গবন্ধু এই মানুষগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলেছিলেন?
(মাঝখানে দৃশ্য-৯ ও দৃশ্য-১০-এর কল্পনা দেখানো হবে।)
বুধা: মাগো! (কল্পনা থেকে ফিরে আসে। শরীরটা যেন নড়াতে পারছে না।)
(শব্দ আসে নিজের কণ্ঠ নিজে শুনছে ‘বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু!)
বুধা: এই তো আমি এখানে। (কষ্ট করে উঠে বসে। বুক ভরে শ্বাস নেয়)
দৃশ্য-৯
(বুধা কল্পনায় হারিয়ে যায়। একটা বাড়িতে বসে রেডিওতে অনেকে মিলে সাতই মার্চের ভাষণ শুনছে।)
(ভাষণ শেষে বুধা)
বুধা: এই মধু এখন থেকে তোরা আমাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে ডাকবি।
মধু: ইস শখ কত! বানরের আবার চাঁদে যাওয়ার সাধ।
বুধা: আমি কি বানর?
মধু: হ্যাঁ তুই বানর। একশবার বানর।
বুধা: হিহি (বলতে বলতে মুখটা অন্ধকার হয়ে আসে বুধার)
বুধা: সেই মধু আর নেই। আগুনে পুড়ে গেছে। লাশের ভিড়ে আমি চিনতে পারিনি কোনটা মধুর লাশ!
দৃশ্য-১০
(বুধা কল্পনায় তার মা-বাবার মৃত্যু দেখে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা জীবিত ছিল)
মা: বাবা বুধা, বাবা, বাবা রে?
বুধা: (হুমড়ি খেয়ে মায়ের ওপর পড়ে) মা, মাগো।
মা: বাবা, তোকে আল্লাহর ভরসায় রেখে গেলাম। বাবা রেÑ
দৃশ্য-১১
(ক্যাম্পের সামনে ঝোপটায় লুকিয়ে আছে বুধা। সে দেখতে পায় একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হাত-পা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে তিনজন রাজাকার। কতগুলো শকুন আকাশে উড়তে দেখা যায়। আবার একজন বোরখা পরিহিতা নারীকে ক্যাম্পে নিয়ে যায় একই ব্যক্তিরা। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে নারীর আর্তনাদ শোনা যায়। ওই পুরুষরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়।)
দৃশ্য-১২
(বাজারের মাঝখান দিয়ে হাঁটছে বুধা। দুএকজন নতুন ঘর দিয়ে দোকান তুলছে। আলি কড়ই গাছের নিচে বাঁশের বেঞ্চি বানিয়ে চা বিক্রি করতে শুরু করেছে।)
আলি: ওই বুধা! এদিকে আয় (বুধা আসে) ওই শত্রæদের না তাড়িয়ে আমি আর চায়ের দোকান বানাব না। তুই যতদিন খুশি ওই পোড়াঘরে থাকবি।
বুধা: খিদে পেয়েছে, আলি ভাই।
আলি: নে, চা বিস্কুট খা। এতে হবে না?
বুধা: খুব হবে। আমি কি কোনোদিন দুটো বিস্কুট একসাথে খাই?
আলি: (হাসতে হাসতে) আমি তো জানি তুই কী খাস! রোদ খেলে তোর পেট ভরে। জোছনা খেলে তোর মন ভরে। বৃষ্টির পানি খেলে তোর বুক ভরে, বাতাস খেলে তোর মগজ ভরে, তুই আর কী খাসরে বুধা?
বুধা: (হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ে। বিস্কুট খাওয়া শেষে চায়ে চুমুক দেয়। তৃপ্তিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আরও দু-একজন মানুষ এসে বসে। চোখ ভিজে ওঠে)
গাঁয়ের লোক: গ্রামের মানুষগুলো কীভাবে দু’ভাগ হয়ে গেলাম।
গাঁয়ের লোক: আহাদ মুন্সির জন্যই যত সমস্যা! হুঃ শান্তি কমিটি করছে। যেই মিলিটারি গ্রাম পুড়লো, বাজার পুড়লো তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আহাদ মুন্সির শান্তি কমিটি!
বুধা: (আকস্মিকভাবে চেঁচিয়ে) যুদ্ধ, যুদ্ধ! (উঠে দৌড় দেয়। নদীর ধারে এসে দাঁড়ায়) গাঁয়ের লোক যখন দুভাগ হয়ে যায় তখন মাঝখান দিয়ে বয়ে যায় যুদ্ধের নদী!
দৃশ্য-১২
(রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে বুধা। পথে দেখা আহাদ মুন্সির)
বুধা: (¯^গত) ওই যে আসছে আহাদ মুন্সি। (প্রকাশ্যে) ¯øামালেকুম, চেয়ারম্যান সাহেব।
আহাদ মুন্সি: (হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়) তোর নামটা যেন কী রে? মনে করতে পারছি না।
বুধা: আমার নাম যুদ্ধ।
আহাদ মুন্সি: য্দ্ধু? (বিস্মিত হয়) বলিস কী? তুই কি পাগল নাকি?
পাশে দাঁড়ানো লোক: হ্যাঁ, হুজুর একদম পাগল।
কুদ্দুস: চলেন চেয়ারম্যান সাহেব, ওটা তো একটা পাগল পোলা। ওই যে কলেরায় ওর মা-বাবা সব মরেছে না! এক রাতে সব শেষ। তারপর থেকে ওর মাথা ঠিক নাই।
আহাদ মুন্সি: আহা রে, আসিস আমার বাড়িতে। গরু চড়ানোর কাজ দেবো। পেটেভাতে থাকবি।
বুধা: কিন্তু একটা কথা চেয়ারম্যান সাহেব…
আহাদ মুন্সি: কী? কিছু বলবি? টাকা দিতে পারব না, বাপু। আমার পকেটে এখন টাকা নাই।
বুধা: আমি আপনার কাছে টাকা চাই না। আমি যার-তার কাছে হাত পাতি না।
আহাদ মুন্সি: কী বললি?
বুধা: বললাম, আপনি তো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। কিন্তু সারা দেশে যে অশান্তি। শান্তি কই?
আহাদ মুন্সি: চুপ বেয়াদ্দপ!
বুধা: নাম রাখলেন বেয়াদ্দপ? ভালো। কেউ আমার নতুন নাম রাখলে আমি খুব খুশি হই।
(বুধা বেয়াদ্দপ, বেয়াদ্দপ বলতে বলতে পথে নামে। তারপর হাহা করে হাসতে থাকে। যেতে থাকে। চেয়ারম্যানের কানে হাসিটা লাগে। আহাদ ভ্রƒ কুচকে তাকিয়ে থাকে)
রাজাকার-২: চেয়ারম্যান সাহেব চলেন।
আহাদ মুন্সি: (অন্যমনস্ক কণ্ঠে) যাব
কুদ্দুস: হ্যাঁ যাবেন তো। একটা বানরের কথায় আপনি এত কী ভাবছেন?
আহাদ মুন্সি: ভাবছি না তো।
রাজাকার-২: তাহলে?
আহাদ মুন্সি: চল যাই।
রাজাকার-৩: চেয়ারম্যান সাব?
আহাদ মুন্সি: (কোনো কথা না বলে হাঁটতে থাকে)
(বিকেলে চায়ের দোকানে বসে বুধা আলি ও মিঠুকে একই রকম দেখতে পায়)
বুধা: আশ্চর্য! আলি ভাই আর মিঠু ভাইকে একই রকম লাগছে। আমি যে কথা ভাবছি সে কথাই ওরা ঠিক সে কথাই ভাবছে। কেমন করে ভেতরে ভেতরে এক হয় মানুষ! এক হওয়ার এখনই তো সময়। এক না হতে পারলে এই বিদেশি সৈনিকগুলো ওদের মেরে ভ‚ত বানিয়ে ফেলবে। (হিহি করে হেসে ওঠে)
মিঠু: হাসছিস কেন, বুধা?
বুধা: ভ‚ত
আলি ও মিঠু: ভ‚ত কি রে?
বুধা: আমরা লড়াই না করলে গ্রামটা একদিন ভ‚তের বাড়ি হবে। না, ভুল বললাম। ভ‚ত না, গ্রামটা ভরে যাবে ভ‚ত আর প্রেতে। ওরা সংখ্যায় বেশি হবে না। কিন্তু ওদের বড় বড় পা, হাত, মাথা দিয়ে ওরা গ্রামটা ভরে ফেলবে।
মিঠু: কী বলছিস বুধা?
বুধা: (হি হি করে হাসে)
আলি: আবার হাসছিস কেন?
বুধা: আপনাদের দুজনকে একরকম দেখাচ্ছে। আপনারা কি দুজন না, একজন?
মিঠু: তুই তো বেশ ধেড়ে ছেলে রে।
(আলি ও মিঠু হাসতে থাকে)
বুধা: আপনারা হাসেন কেন?
আলি: আমরা তোকে বুঝতে পারছি রে।
বুধা: কেমন?
আলি: তোকে ধরলে আমরা এখানে তিনজন। কিন্তু আমরা তিনজন নই, একজন। ঠিক না?
বুধা: হ্যাঁ ঠিক। (গম্ভীর হয়ে যায়)
মিঠু: তিনজন একজন হলে কী হয় জানিস তো?
বুধা: জানি। শক্তি বাড়ে। বড় শক্তি হয়। এক হলে লড়াইয়ে শত্রæরা হারে।
মিঠু: সাবাশ। তোকে দিয়েই হবে।
বুধা: আলি ভাই, এক শিশি কেরোসিন তেল হবে। (তেল দেয় আলি) আমি গায়ে খেটে তোমার তেলের দাম শোধ দেবো, আলি ভাই।
আলি: ওইটুকু তেলের দাম শোধ দিতে হবে না।
মিঠু: হ্যাঁ, দিতে হবে না। আমরা জানি তুই ভালো একটা কিছু করার জন্য তেল নিয়েছিস।
আলি: হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। (দুজনে তাকিয়ে থাকে বুধার দিকে। বুধা হেসে পথে পা বাড়ায়)
দৃশ্য-১৩
(পোড়া ঘরে ফিরে বুধা বাঁশের লাঠির মাথায় শুকনো পাট জড়িয়ে চারটা মশাল বানায়। আহাদ মুন্সির বাড়ির দিকে ছোটে। শিশি থেকে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে আহাদ মুন্সির ছনের চালাঘরের ওপর ছুঁড়ে মারে। সবাই পালাতে ব্যস্ত। ফিরে আসে পোড়া ঘরে। শুনতে পায়-বাইরে থেকে)
আলি: (ফিসফিসিয়ে) জয় বাংলা
মিঠু: জয় বাংলা
(বুধা বেরিয়ে আসে)
বুধা: জয় বাংলা (দুজনে বুধাকে জড়িয়ে ধরে। এক বোতল কেরোসিন এগিয়ে দেয়)
আলি: এই বোতলটা রাখ। দরকারমতো কাজে লাগাবি। এখন থেকে তোর নতুন নাম জয় বাংলা।
মিঠু: তুই আমাদের শক্তি। আমাদের জয় বাংলা।
বুধা: (হিহি করে হাসে)
আলি: হাসছিস যে?
বুধা: খুশিতে। উহ্ মাগো, এমন খুশি আমার জীবনে আর আসেনি। আলি ভাই, মিঠু ভাই বিশ্বাস করো- বাবা-মা-ভাই-বোন মারা যাওয়ার পর আমি জানতামই না যে খুশি কী!
মিঠু: জয় বাংলা খুশি যা হয়েছিস ঠিক আছে। তবে ভুলে যাস না যে এখন কাজের সময়।
বুধা: হ্যাঁ, হ্যাঁ জানি সামনে আমাদের অনেক কাজ।
আলি: কঠিন কাজ।
মিঠু: বড় কাজ।
বুধা: (হিহি করে হাসে)
মিঠু: আমরা চলে যাচ্ছি, জয় বাংলা। আহাদ মুন্সি আমাদের ছাড়বে না। ঠিকই সন্দেহ করবে। আজ রাতেই পালাব। তুই সাবধানে থাকিস। তুই তো ছোট, তোকে এখনই সন্দেহ করবে না। (বুধাকে জড়িয়ে ধরে)
আলি: আমরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছি। ওই মিলিটারি ক্যাম্পটা উড়িয়ে দিতে হবে। সময় মতো আসব। জয় বাংলা। তুই ভয় পাস না।
বুধা: আমি তোমাদের জন্য তৈরি হয়ে থাকব। যখনই আসবে দেখবে আমি রেডি।
আলি: শাবাশ। তোকে দেখেই বুঝতে পারছি যে দেশটা ¯^াধীন হবে।
মিঠু: তোকে দেখে আমাদের সাহস বেড়ে গেছে। এখন আমাদের মরতেও ভয় নেই।
(দুজনে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।)
(কড়ই গাছের নিচে বাঁশের মাচাটার ওপর শুয়ে বলে ওঠে ‘জয় বাংলা’)
(ভোর বেলা আহাদ মুন্সির ছেলে মতিউর ওকে কান ধরে ডেকে তোলে)
মতিউর: এই শুয়োরের বাচ্চা ওঠ।
বুধা: (বিস্মিত হয়ে চোখ খোলে)
মতিউর: চিনতে পেরেছিস? আমি আহাদ মুন্সির ছেলে মতিউর। আলি কোথায়?
বুধা: জানি না
মতিউর: তুই জানিস, বল।
বুধা: কেমন করে জানব? আলি আমার কে? ও কি আমার মায়ের পেটের ভাই?
মতিউর: ইস্, ঢং দেখানো হচ্ছে। একটা পিচ্চি শয়তান। আমাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে কে?
বুধা: আগুন! মতিউর: আগুন কি জানিস না?
বুধা: (উঠে ‘আগুন’ ‘আগুন’ বলতে বলতে নদীর ঢালু বেয়ে নেমে যায়)
মতিউর: (হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে) তোর সামনে খুব খারাপ দিন আছে, বুধা। তোকে পেলে আমি চিবিয়ে খাব। বান্দর একটা। মনে রাখিসÑ (দু’একজন লোক আসে)
লোক: ওকে মাফ করে দেন। ওর কি মাথা ঠিক আছে। বাপ-মা মরা।
মতিউর: আরে রাখেন বাপ-মা মরা। বাপ-মা যেন আর কারও মরে না। (রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে যায়)
(বুধাকে দেখা যায় মাথা কাৎ করে নদীর ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে)
দৃশ্য-১৪
(রাজাকার কমান্ডারের বাড়িতে আগুন লেগেছিল। কাজের মেয়েটিকে সন্দেহ করে বাড়ি থেকে বের করে দিল কমান্ডার। জামগাছের নিচে বসে মেয়েটি অনেকক্ষণ কাঁদল। বুধা এসে মেয়েটিকে দুটো জিলাপি খেতে দেয়।)
বুধা: খা
ফুলকলি: (কাঁদতে কাঁদতে) আমি পাটখড়ি চুলার পাশে রাখিনি, বুধা। আমি জানি না কীভাবে আগুন লাগল।
বুধা: (পাশে বসে কোমরে গুঁজে রাখা মলমের কৌটা বের করে দেয়) যেখানে যেখানে কেটেছে, লাগিয়ে দে।
ফুলকলি:মলম?
বুধা: হ্যাঁ, তোর জন্য এনেছি। রাজাকার কমান্ডার যখন তোকে মারছিল তখনই বুঝেছিলাম যে এই মলমটা তোর লাগবে। লাগিয়ে দে, জ্বালাপোড়া কমবে। আহারে যুদ্ধের জন্য আমাদের কত কিছু সইতে হয়।
ফুলকলি: যুদ্ধ! (অবাক হয়ে তাকায়) যুদ্ধ কোথায়? আগুন লাগা কি যুদ্ধ?
বুধা: ধর, এক রকম তাই। আমি এমনি বললাম। তোর নাম কী রে?
ফুলকলি: ফুলকলি
বুধা: চল আমার সঙ্গে।
ফুলকলি: কোথায়?
বুধা: আতা ফুপুর বাড়িতে। ওখানে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে থাকবি।
ফুলকলি: এখন গেলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
বুধা: মারবে না। এরা এখন ঘর-দুয়ার নিয়ে ব্যস্ত। এদের মেজাজ ঠাণ্ডা হোক, তারপরে আসবি। তোর তো কেউ নেই। কোথায়ই বা যাবি। আয়। (ফুলকলির হাত ধরে টানে)
(সবার চোখ এড়িয়ে দুজনে পথে নামে।)
বুধা: তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে, ফুলকলি?
ফুলকলি: মলম লাগানোর পর জ্বালা কমেছে।
বুধা: যুদ্ধের সময় কত জ্বালা যে সইতে হয়।
ফুলকলি: তুই বারবার যুদ্ধের কথা বলছিস কেন? তুই কি যুদ্ধ করছিস?
বুধা: হ্যাঁ।
ফুলকলি: কার সঙ্গে?
বুধা: শত্রæর সঙ্গে।
ফুলকলি: শত্রæ! তুই কি তাহলে আগুন…
বুধা: আগুন! আগুন! আমাদের চারদিকে আগুন। আয় দৌড়াই। (হ্যাঁচকা টানে ফুলকলিকে টান দিলে দুজনেই দৌড়াতে থাকে। থেমে হাঁপায়)
ফুলকলি: আমি সব বুঝতে পেরেছি বুধা। আমি তোর শত্রæ নই।
বুধা: আমি তো জানি তুই আমার শত্রæ নস্। আমরা দুজনে এক।
ফুলকলি: ওই বাড়িতে কিছু ঘটলে আমি তোকে জানিয়ে দেব।
বুধা: ফুলকলি এখন থেকে তোকে আমি জয় বাংলা ডাকব।
ফুলকলি: জয় বাংলা, জয় বাংলা। জয় বাংলা, জয় বাংলা… (বলতে বলতে ফুলকলি ছুট দেয়। একদৌড়ে দুজনেই আতা ফুপুর বাড়িতে আসে।)
ফুলকলি: এখন থেকে তোকে আমি ‘যুদ্ধ’ ডাকব বুধা।
বুধা: ডাকিস, তবে একা পেলে, সবার সামনে ডাকিস না।
ফুলকলি: আচ্ছা। (কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে বুধার দিকে তাকায়)
বুধা: ফুপু, ফুপু। আমি এসেছি।
ফুপু: খুব ভালো করেছিস। ওমা ফুলকলি যে? তোদের বাড়িতে আগুন লেগেছে না?
বুধা: মালিক ওকে খুব মেরেছে ফুপু। তোমার বাড়িতে পান্তা আছে ফুপু? আমাদের খেতে দাও।
(পান্তা খেয়ে আতা ফুপুর উঠোনে কাকতাড়–য়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বোলতাটা কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেলে মনে হয় রাইফেল-মেশিনগানের শব্দ ভেসে আসছে। রাজাকার কুদ্দুস এসে দাঁড়ায়)
কুদ্দুস: তোর মনে কি খুব আনন্দ? কাকতাড়–য়া সেজেছিস কেন?
বুধা: (হিহি করে হাসে। কাকতাড়–য়া অবস্থায় শরীরে ঝাঁকুনি আসে)
ক্দ্দুুস: হাসছিস কেন? তোর হয়েছে কী? কমান্ডারের বাড়ি পুড়েছে তাতে গাঁয়ের মানুষ সবাই দুঃখ করছে। আর তুই হাসছিস? ঢং করে আবার কাকতাড়–য়া সাজা হয়েছে।
বুধা: হাসব না কেন? কাকতাড়–য়াকেও মানুষের মতো লাগে যে।
কুদ্দুস: বানর একটা।
বুধা: ঠিকই তোমার মতো। আমি তোমার মতো হয়েছি। কী আনন্দ ধ্ইে, ধেই। নৌকা চালাও হেঁইও।
(কুদ্দুস কষে থাপ্পড় মারার জন্য হাত তুলতেই লাফ দিয়ে সরে যায়)
কুদ্দুস: হাতের কাছে পেলে তুলে একটা আছাড় মারব, শয়তান। মিঠু কোথায় বল?
বুধা: নদীর তলে খুঁজে দেখ। আমাকে জিজ্ঞেস কর কেন? আমি কি ওদের গাজ্জিয়ান?
কুদ্দুস: শুয়োরের বাচ্চা।
বুধা: মেশিনগান বল। আমার নাম মেশিনগান।
কুদ্দুস: হারামজাদা।
(কুদ্দুস ওকে তাড়া করে। কচুরিপানা পুকুরে পড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক ডুবে ওপাড়ে গিয়ে ওঠে)
দৃশ্য-১৫
(পোড়া চালাঘরের নিচে বুধা ঘুমিয়ে ¯^প্ন দেখছে। চারদিকে ফুল-পাখিতে ভরা সুন্দর বাগান। হাজার প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। ফুলকলি ও বুধা হাত ধরে হাঁটছে। একসময় ফুলকলি অনেকগুলো প্রজাপতি ধরে আনে বুধাকে দেয়।)
ফুলকলি: বুধা, এসব প্রজাপতি তোর জন্য। তুই যে আমার জন্য একটা যুদ্ধ জিতেছিস।
বুধা: আমি জিতেছি?
ফুলকলি: হ্যাঁ রে জিতেছিস। দেখ চারদিকে কেমন বাজি ফুটছে। দেখ তোর মাথায় আমি প্রজাপতি ছড়িয়ে দিচ্ছি।
(বুধা দেখতে পায় ওর পুরো শরীরে প্রজাপতি সেঁটে আছে। ভীষণ খুশি হয়ে প্রজাপতি ওড়াতে থাকে। ফুলকলি হাততালি দেয়)
দৃশ্য-১৬
(শাহাবুদ্দিন এসে বুধাকে ডাকে)
শাহাবুদ্দিন: জয় বাংলা-। বঙ্গবন্ধু? এই মেশিনগান?
বুধা: (ধড়মড়িয়ে উঠে বসে) (¯^গত) আশ্চর্য, ঘরে এত আলো কেন? রাত না দিন?
শাহাবুদ্দিন: এই যুদ্ধ উঠে আয়। কিরে তোর ঘুম ভাঙেনি? আমার ডাক কি তোর কানে পৌঁছাচ্ছে না?
বুধা: (¯^গত) আশ্চর্য, কার কণ্ঠ? বোলতাটা কি কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেল?
শাহাবুদ্দিন: চুপ করে আছিস কেন, কাকতাড়–য়া?
(বুধা হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে। ওকে জড়িয়ে ধরে শাহাবুদ্দিন)
বুধা: ওহ্ শাহাবুদ্দিন ভাই, যুদ্ধ! যুদ্ধ! (স্যালুট করে)
শাহাবুদ্দিন: (ভুরু কুঁচকে) কি রে স্যালুট করলি কেন?
বুধা: আপনি তো মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। স্যালুট করব না? কী যে বলেন?
শাহাবুদ্দিন: ঠিক আছে ঠিক আছে। তুই একটা বাহাদুর ছেলে আমি শুনেছি।
(হাসতে হাসতে শাহাবুদ্দিনের হাত ধরে মাচানের ওপর এসে বসে)
শাহাবুদ্দিন: আলি আর মিঠুর কাছে তোর কথা শুনেছি। তুই তো এই গাঁয়ে একাই যুদ্ধ করছিস।
বুধা: যুদ্ধ? আমি?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ রে। ওই যে বাড়িগুলো পুড়েছিস, এটাও যুদ্ধ। এবার বড় যুদ্ধ করতে হবে।
বুধা: সেটা কী?
শাহাবুদ্দিন: মিলিটারির ক্যাম্পটা উড়িয়ে দেব আমরা। তুই থাকবি আমাদের সাথে। রেকি করার কাজটা তোকে করতে হবে।
বুধা: এ আর এমন কী কঠিন কাজ, খুব পারব।
শাহাবুদ্দিন: জানি তো তুই পারবি। শোন কয়টা সেপাই পাহারা দেয়, কয়জন তাঁবুর ভেতর থাকে, মেশিনগানটা কোথায় ফিট করে রেখেছেÑ সব খবর নিয়ে আসবি। আমি আবার দুদিন পর আসব। যা ঘুমিয়ে পড়।
বুধা: কীভাবে ফিরবেন?
শাহাবুদ্দিন: নৌকায় নদী পেরিয়ে চলে যাব। ভয় পাস না।
দৃশ্য-১৭
(বুধা আবার এসে শুয়ে পড়ে। ¯^াধীনতার ¯^প্নে মনে প্রবল আনন্দ। ¯^প্নে দেখে মা সবাইকে ইলিশ মাছ ও পিঠা বিতরণ করছে। সব ভাই-বোন মিলে খাচ্ছে)
দৃশ্য-১৮
(বুধা একগাদা পেয়ারা নিয়ে মিলিটারি ক্যাম্পের কাছে যায়। গাঁয়ের স্কুল ঘরটিতে ওরা ক্যাম্প বানিয়েছে। সামনের মাঠে বেশ কিছু তাঁবু বানানো। ওর কল্পনায় ভেসে ওঠে স্কুলের অতীত দিনে স্মৃতি। অনেকগুলো ছাত্রের সঙ্গে মাঠে খেলছে বুধা। কল্পনা করতে করতে ওর মাথার কাছ দিয়ে বোলতাটা উড়ে যায়। তার জামার পকেটে পেয়ারা, কোমরে গোঁজা পেয়ারা। ক্যাম্পের কাছে বসে প্রথমে নিজে একটি পেয়ারায় কামড় দেয়। আরেকটি পেয়ারা এগিয়ে দেয় পাহারা দেওয়া সৈনিকটির দিকে।)
বুধা: (ইশারায়) খাবে?
সৈনিক: (দাঁত কেলিয়ে ছোঁ মেরে পেয়ারাটা নেয়। কামড় দেয়।) বহুত আচ্ছা, বহুত মিঠা। আওর হ্যায়?
(বুধা সবগুলো পেয়ারা বের করে মাটিতে ফেলে দেয়। আশপাশ থেকে আরও দুএকজন সেপাই এগিয়ে আসে। ভালো পেয়ারাগুলো বেছে নিতে থাকে)
সৈনিক-২ : (পেয়ারা হাতে নিয়ে) তুমকো নাম কেয়া?
বুধা: (হেসে) কাকতাড়–য়া
সৈনিক-২: কেয়া বাত? কাক…।
(হেসে গড়িয়ে পড়ে সবাই। একজন সৈনিক ওর পিঠ চাপড়ে দেয়। ও ওদের পাশে বসে পা ছড়িয়ে চারদিকে দেখতে থাকে। সবাই মনোযোগ দিয়ে পেয়ারা খাচ্ছে। কারও গাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। বুধা হা হা করে হেসে ওঠে। এমন সময় আহাদ মুন্সি এসে দাঁড়ায়। তার সঙ্গে তিনজন রাজাকার)
আহাদ মুন্সি: এই বেয়াদব, হাসছিস কেন?
বুধা: লোহার টুপি কি মানুষের মগজ খায়?
আহাদ: (ভ্রƒ কুঁচকে) কী বললি?
বুধা: লোহার টুপি কি মানুষের মগজ খায়?
আহাদ: (চোখ লাল হয়ে ওঠে) সেদিনও তুই আমার সঙ্গে বেয়াদপি করেছিলি, আজও করলি, তোর নাম কী?
বুধা: কাকতাড়–য়া
আহাদ: কাকতাড়–য়া! ঠিক করে বল?
বুধা: কাকতাড়–য়া (বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ে। সুর করে বলে-) লোহার টুপি মানুষ খায়, মানুষ খায়…।
আহাদ: (চেঁচিয়ে) পাগল না ছাই। আস্ত বদমাশ একটা। এই, ওকে কাকতাড়–য়া বানিয়ে রাখ।
(আহাদ মুন্সির সঙ্গে লোকেরা শক্ত করে দু’হাত চেপে ধরে দু’চারটে ঝাঁকুনি দিয়ে-)
কুদ্দুস: আর বদমাশি করবি তো জানে মেরে ফেলব। ঘুঘু দেখেছ কিন্তু ফাঁদ দেখনি, চাঁদ।
(ওরা সবাই দুপাশে কাকতাড়–য়া বানানোর উৎসবে মেতে ওঠে। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে দাঁড়ায়)
বুধা: আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছ কেন? আমি তো হেঁটে যেতে পারি। ভয় পেয়ে আমি পালাই না।
রাজাকার-২: ইস, বড় বড় কথা।
কুদ্দুস: বলবে না। বাপ-মা-ভাইবোন সব তো খেয়েছে।
বুধা: খবরদার বাজে কথা বলবে না।
রাজাকার-২: ইস নবাব। নবাব হয়েছে। মারব এক থাপ্পড়।
বুধা: মারো না। মেরেই ফেল। লোকে জানুক যে আমি ¯^াধীনতার যুদ্ধে শহিদ হয়েছি।
কুদ্দুস: কী বললি?
বুধা: যা বলেছি তা তো দুকান দিয়ে শুনেছই। আবার কী?
(একজন রাজাকার ওর গালে ঠাস করে চড় মারে।)
বুধা: (গর্জে ওঠে) আমি শোধ নিতে জানি।
রাজাকার-২: আবার কথা।
(এবার চারজনে মিলে জোর করে ওকে চ্যাংদোলা করে ধরে। )
বুধা: তিনজনে মিলে একজনকে মার লজ্জা করে না?
রাজাকার-৩: লজ্জা কিসের? মেরে ভ‚ত করে ফেলব। তখন বুঝবি। আজ ছেড়ে দিলাম। বাপ-মা মরা ছেলে বলেই রেহাই পেলি।
(ওরা ওকে মাঠের মাঝখানে এনে ধাম করে ফেলে দেয়। ও নড়ে না। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে চোখ বোজা। ওরা মাঠের মাঝখানে একটা বাঁশ পুঁতে বাঁশের সঙ্গে শরীরটা বাঁধে। আর একটা বাঁশের ওপর ডান হাত অন্য পাশে বাম হাত। ওর গায়ের জামাটা বেঁধে দেয় মাথায়। তারপর রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি এনে হাঁড়ির নিচের কালি মুখে লাগায়। বুক-পিঠও আঁকাবাঁকা লেখায় ভরিয়ে দেয়। রাজাকার তিনজন হিহি করে হাসতে হাসতে চলে গেলে ওর চোখ জ্বলে ওঠে। মিলিটারি চেয়ে চেয়ে দেখে। সন্ধ্যা হয়ে আসে। মিলিটারি ওর বাঁধ খুলে দিয়ে বলে-)
মিলিটারি: ভাগ হিঁয়াসে।
(ও চলে যায় না। খুব শান্তভাবে হাঁটা শুরু করে।)
দৃশ্য-১৯
(সকালে তিনজন রাজাকার বুধাকে খুঁজতে আসে। ও তখন জ্বরে কোঁকাচ্ছে। )
রাজাকার: এই কাকতাড়–য়া, কাকতাড়–য়া…
বুধা: মা, মা পানি দাও।
(খড়ের বিছানায় খড় লেগে যাচ্ছে ওর গায়ে। কাছেই একটা কুকুর শুয়ে আছে। রাজাকাররা হঠাৎ ওকে ভ‚তের মতো দেখতে পায়। পালিয়ে যায়)
রাজাকার-২: ছেলেটি শুধু পাগল নয়, আজ ওকে একদম ভ‚তের মতো লাগছে। কালি মাখানো মুখটা দেখে আমার গা ছমছম করছিল।
কুদ্দুস: ঠিক বলেছিস। আমারও ভয় করছিল। তাছাড়া ছেলেটা কেমন করে যে কথা বলে। শুনলে গা হিম হয়ে যায়। আমার গায়ে কাঁপুনি ওঠে।
রাজাকার-৩। ওই ভ‚তটার তো জ্বর। তাহলে চেয়ারম্যানের বাড়িতে আগুন দিল কে?
(সবাই ভয়ে আঁতকে ওঠে)
রাজাকার-২: রাতের বেলা নিশ্চয় মুক্তিবাহিনীর কেউ আসে। আমি এখন বুঝে গেছি। আমাদের আরও জোরদার ব্যবস্থা নিতে হবে।
কুদ্দুস: ঠিক বলেছিস। আমারও তাই মনে হচ্ছে। আমরা আরও সতর্ক না হলে মুক্তিবাহিনী আমাদের মেরে ফেলবে। দিন দিন ওদের দাপট বাড়ছে।
রাজাকার-২: আমার মনে হয় বুধারও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ আছে।
রাজাকার-৩: আরে ধুরো! ওইটুকু ছেলেকে কে পাত্তা দেবে। ও কি বন্দুক চালাতে জানে। নাকি গ্রেনেডের পিন খুলতে শিখেছে? শুনলি না সেদিন কীভাবে শহিদ হওয়ার কথা বলল।
কুদ্দুস: বাপ-মা নাই তো এজন্য মরণে ভয় নাই। পাগল।
রাজাকার-২: আমার মনে হয় না ছেলেটা অত পাগল।
রাজাকার-৩: জ্বর হয়েছে। পাশে তো কেউ নাই। দেখিস আজ রাতে ওটা মরবে। জ্যান্ত থাকতেই তো ভ‚ত হয়েছে।
(তিনজনেই হাসতে হাসতে চলে যায়)
দৃশ্য-২০
(গভীর রাতে ওকে শাহাবুদ্দিন বাইরে থেকে ডাকে)
শাহাবুদ্দিন: যুদ্ধ ও যুদ্ধ? জয় বাংলা? বঙ্গবন্ধু?
(বুধা চমকে উঠে বসে। লাফিয়ে বাইরে আসে)
শাহাবুদ্দিন: কেমন আছিস মানিকরতন?
বুধা: ভালো। শাহাবুদ্দিন ভাই তুমি কেমন আছো?
শাহাবুদ্দিন: তোর জ্বর ভালো হয়েছে রে?
বুধা: (হেসে ওঠে) ওটা তো ভাল্লুকের জ্বর। যায় আর আসে। যুদ্ধের সময় কি জ্বরের কথা এত ভাবলে চলে?
শাহাবুদ্দিন: না না ভাবতে হবে। সুস্থ না থাকলে যুদ্ধ করবি কীভাবে? শরীরের তো শক্তি চাই। ঠিক বলিনি?
বুধা: বলেছ। তুমি ছবি আঁকার মানুষ। তুমি তো ঠিকই বলবে।
শাহাবুদ্দিন: সেদিন তোর খুব কষ্ট হয়েছিল, না রে?
বুধা: যুদ্ধ করতে তোমাদের কি কষ্ট হয়?
শাহাবুদ্দিন: না তো। কষ্ট হবে কেন?
বুধা: তাহলে আমার কষ্ট হবে কেন?
শাহাবুদ্দিন: শাবাশ
বুধা: এবার কী করতে হবে বলো-
শাহাবুদ্দিন: শুনেছি ওরা একটা বাঙ্কার করবে। ক্যাম্পে বাঙ্কার করে ফেললে ওদের হারিয়ে দেওয়া কঠিন হবে।
বুধা: তার আগেই ক্যাম্পটা উড়িয়ে দিতে হবে এই তো?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, আমি একটা মাইন নিয়ে এসেছি। যেদিন বাঙ্কারটা বানাবে সেদিন তোকে মাটি কাটার দলে কাজ করতে হবে। কাজ শেষ হলে যেভাবেই হোক এই মাইনটা মাটির নিচে রেখে আসতে হবে। পারবি তো?
বুধা: এ আর এমন কি কঠিন কাজ। খুব পারব। (হিহি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে)
শাহাবুদ্দিন: হাসছিস যে!
বুধা: হাসব না তো কী! তোমার কথা শুনে হাসি পায়।
শাহাবুদ্দিন: তুই কি জানিস, সাবধানে থাকাটা মুক্তিযুদ্ধের কৌশল?
বুধা: জানি, আচ্ছা, বলতো ওরা বাঙ্কার করবে কেন?
শাহাবুদ্দিন: ওরা বুঝতে পেরেছে যে নদীপথে এসে আমরা আক্রমণ করতে পারি। তা এমন সতর্ক ব্যবস্থা।
বুধা: (হাসিতে গড়িয়ে পড়ে)
শাহাবুদ্দিন: তুই নানা ভঙ্গির মানুষরে বুধা। দেশ ¯^াধীন হলে তোর এই ভঙ্গিগুলোর ছবি আঁকব। ¯^াধীনতাকে আঁকব।
বুধা: (আবার হাসে)
শাহাবুদ্দিন: যুদ্ধ, এমন হাসিস না রে।
বুধা: তুমি আমাকে হাসতে মানা করো না। তুমি চলে গেলে আমি একাই হাসব।
শাহাবুদ্দিন: না, একা হাসিস না, তুই আমার সামনে হাসবি। আমি একটা সাহসী ছেলের ছবি আঁকব।
বুধা: তুমি আর এখানে বেশিক্ষণ থেকো না, শাহাবুদ্দিন ভাই।
শাহাবুদ্দিন: শোন্ পরশুদিন সন্ধ্যায় আমি নৌকা নিয়ে তৈরি থাকব। ক্যাম্পটা যখন মাইন ফেটে হাউইবাজির মতো ছিটকে উঠবে তখন আমরা নদীপথে সরে পড়ব।
বুধা: (হাসতে হাসতে) ভারি মজার খেলা
শাহাবুদ্দিন: যাই রে, জয় বাংলা।
বুধা: এসো। সাবধান। আবার দেখা হবে।
(শাহাবুদ্দিন অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। ছেলেটি মাচার ওপর গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। এক পর্যায়ে সেখানেই শুয়ে পড়ে)
দৃশ্য-২১
(বুধা পথের ধারে বসা। একবার ঘোরাফেরা করে। ফড়িং ধরে। ঘাসের কচি ডাঁটা চিবোয়। ডোবা থেকে পানি তুলে খায়।)
বুধা: ধ্যাৎ ! কী যে হলো! মাটি কাটার দল তো আজ এলো না।
(গুটি গুটি পায়ে মিঠুদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। রান্নাঘরের বারান্দায় পা গুটিয়ে বসে)
বুধা: খালা, আমার খিদে পেয়েছে। সারাদিন খাইনি।
মিঠুর মা: তোকে কত বলি রোজ এসে ভাত খেয়ে যাবি। কেন যে তুই আসিস না। আমার সামনে বসে তোকে ভাত খেতে দেখলে আমার কষ্ট কমে যায়। বুকের শূন্য জায়গাটা ভরে ওঠে। মনে হয়, এই বুঝি দেশটা ¯^াধীন হলো।
বুধা: (মৃদুু হাসে)
(মিঠুর মা সানকিভরা ভাত দেয়। বেগুন ও ট্যাংরা মাছের তরকারি)
বুধা: উহ্ কী যে মজা! কী আনন্দ! (হাপুস হুপুস খায়। মিঠুর মা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে খুব আনন্দ)
মিঠুর মা: ছন্নছাড়া, আমার মধুকে তো পাকিস্তানিরা মেরে ফেলল। মিঠুও বাড়ি ছেড়েছে। মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে থাকে। তোকে পেলে তোর খালু আর আমি দুঃখ ভুলব। এখন থেকে তোকে আমি মধু বলে ডাকব কেমন?
মধু: (একটু চুপ করে থেকে) শুধু মধু না শহিদ মধু।
মিঠুর মা: শহিদ মধু? আমার মধু রে…(কাঁদতে শুরু করে। গগননবিদারি চিৎকার)
(বুধা ভাত না খেয়ে বাড়ির পেছনে এসে ছিটিয়ে দেয়। কাকেরা উড়ে আসে। ও কাকের খাওয়া চেয়ে দেখে। বাড়িতে ফিরে এসে দেখে খালা চোখ মুছছে।)
বুধা: যাই খালা।
মিঠুর মা: তুই আসবি?
বুধা: জানি না। অনেক কাজ?
মিঠুর মা: রোজ রোজ এসে ভাতটা তো খেয়ে যেতে পারিস।
বুধা: অনেক কাজ। আচ্ছা।
(বিড়বিড় করে বলে ও ঘাড় কাত করে। মিঠুর মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে)
দৃশ্য-২২
(বুধার সঙ্গে পথে কুন্তির দেখা হয়। কুন্তি একগাদা শাপলা তুলে বাড়িতে যাচ্ছিল।
কুন্তি: কতদিন তুমি আমাদের বাড়িতে আসো না বুধা ভাই?
বুধা: সময় পাই না রে। অনেক কাজ।
কুন্তি: কী এত কাজ? আমাকে দেখতে তোমার ইচ্ছে হয় না? আমার ভীষণ ইচ্ছে হয় তোমাকে দেখার। কতদিন বাজারে গেলাম কিন্তু তোমার দেখা পেলাম না।
বুধা: আমার অনেক কাজ কুন্তি।
কুন্তি: আমি জানি তোমার অনেক কাজ। আমিও তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করব।
বুধা: যুদ্ধ করবি?
কুন্তি: না তো কি? করবোই তো। তুমি শুধু বলবে, আমাকে কী করতে হবে।
বুধা: চল, বাবা-মায়ের কবরটা দেখে আসি।
কুন্তি: চলো। তুমি তো জানো না, যে আমি চাচা-চাচির কবর পরিষ্কার করে রাখি। ঘাস সাফ করি। শুকনো পাতা উঠিয়ে ফেলে দেই। আমি প্রতিটি কবরের মাথায় একটি করে গাছ লাগিয়েছি।
বুধা: তুই এত কিছু করিস কুন্তি?
কুন্তি: করি তো।
বুধা: কেন করিস?
কুন্তি: তুমি তাহলে খুশি থাকবে এজন্য।
বুধা: কুন্তি!
(কুন্তির চোখে খুশি। বুধা ওর হাত জড়িয়ে ধরে। কবরের কাছে আসে। বিভিন্ন গাছ চেয়ে চেয়ে দেখে। বুধা মায়ের কবরের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে)
বুধা: মা, তুমি আমাকে দোয়া করো। তোমার ছেলের মাথায় অনেক কাজ। সামনে অনেক কাজ করতে হবে। যদি তোমার সঙ্গে এখানে বসে আর কাজ না করতে পারিÑÑ
কুন্তি: (গলা উঁচু করে) এসব কথা কী বলছ বুধা ভাই। তুমি কোথায় যাবে?
বুধা: যাব না, যেতে পারি।
কুন্তি: কোথায়?
বুধা: আকাশে
কুন্তি: আকাশে কেন?
বুধা: যদি ওই সৈনিকগুলো আমাকে মেরে ফেলে। যদি ওদের গুলিতে আমার বুক ফুটো হয়ে যায়।
কুন্তি: ওহ্ আল্লাহ্ রে…। (কুন্তি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে)
বুধা: কাঁদিস না। থাম। আমি তো জানি তুই ছাড়া আমার আপন কেউ নাই। তুই কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়।
কুন্তি: (কান্না থামিয়ে) ছাই হয়।
(বুধা ওর মাথায় চাঁটি মেরে আবার কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়)
বুধা: তোমার ছেলে যেন আনন্দের দিনগুলো ফিরে পায় বাবা। যেন যুদ্ধ করে দেশ ¯^াধীন করতে পারে। বাবা, তুমি আমাকে দোয়া করো, যেন সাহস না হারাই। (ডুকরে কেঁদে ওঠে বুধা)
(অবাক হয় কুন্তি। বুধা লজ্জা পেয়ে চুপ করে থাকে)
কুন্তি: (তীব্র ভাষায়) মরণের কথা মনে করলে যুদ্ধ করা যায় না। যুদ্ধ করলে মরতে তো হবেই।
বুধা: কুন্তি! ত্ইু একটা খুব ভালো মেয়ে।
কুন্তি: এই যে শাপলা তুলে এনেছি কেন জানো?
বুধা: খিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য।
কুন্তি: খিদে না মরণ। যুদ্ধ ছাড়াও মরণ থাকে।
(বুধা অবাক হয়। তাকিয়ে দেখে কুন্তির দিকে)
কুন্তি: যাই বাড়িতে। মাকে এগুলো দিলে মা রাঁধবে। তবেই না আমাদের খাওয়া হবে। তুমি অনেকদিন আমাদের বাড়িতে যাওনি। আজ চলো।
বুধা: হ্যাঁ চল। চাচিকে দেখে আসি।
(বুধা কুন্তির হাত ধরে হাঁটতে থাকে।)
দৃশ্য-২৩
(মাটি কাটার দল ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছে। বুধা এক দৌড়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়)
বুধা: ফজু চাচা, আমি আপনাদের সঙ্গে মাটি কাটব।
ফজু: পারবি? ওই তো শরীর। তোর গায়ে কি বল আছে? যা, ভাগ।
বুধা: কাজ না করলে খাব কী? আমার খিদে পায় না? আমার কি কেউ আছে?
(বুধা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে)
ফজু: হয়েছে, হয়েছে, কাঁদতে হবে না। কাঁদিস না।
(সবাই মিলে ওকে সান্ত¦না দেয়)
ফজু: আয় আমাদের সঙ্গে। দলে থাকলে আহাদ মুন্সি তোকে না করতে পারবে না।
(বুধা দলে মিশে যায়। গামছায় পেঁচিয়ে মাইনটা কোমরের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে। গায়ে ঢোলা জামা। বোঝাই যায় না যে ভেতরে কিছু আছে )
(বাঙ্কার কাটা শুরু হয়েছে। সবাই খোঁড়খুঁড়িতে ব্যস্ত। আহাদ মুন্সির ছেলে মতিউর কাজের তদারকি করছে। ধুমকি ধামকি দিচ্ছে। বুধাকে দলে নেওয়ার জন্য ফজু মিয়াকে বকাবকি করে। বুধা দৌড়ে দৌড়ে মাটি নিয়ে ফেলে আসে। মতিউর প্রশংসা করে অবশেষে)
মতিউর: তুই তো ভালোই খাটতে পারিস রে। (¯^গত) মা, বাবা মরে গিয়ে ছেলেটা বখে গেছে। নইলে কিছু একটা হতে পারত। (প্রকাশ্যে) এই তোমরা এইটা শেষ করে তারপর খেতে যাবে। আমি বাড়ি থেকে খেয়ে আসি।
(সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ফজু পুকুরে হাত ধুতে যায়)
ফজু: সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে কি থাকা যায়? ঠুস করে গুলি এসে যে বুক ফুটো করে দেবে। এই শুয়োরের বাচ্চারা তো পাখির মতো মানুষ মারে।
বুধা: চাচা, আমি একবার ভেতরটা দেখে আসি? বাঙ্কার কেমন এ তো আর এই জীবনে দেখা হবে না।
ফজু: যাবি তো যা। ভেতরে ঢুকে দেখে আয়। কিন্তু সাবধান। সন্ধ্যার আগে ফিরব আমরা।
(মুহূর্তের মধ্যে বাঙ্কারে ঢুকে মাটি সরিয়ে পুঁতে ফেরে মাইনটা। তারপর শিস বাজাতে বাজাতে উঠে আসে)
ফজু: কি রে? কেমন হয়েছে
বুধা: দারুণ, ঢুকলে আর উঠতে মন চায় না। দেখো সেপাইগগুলো ওটার ভেতর থেকে আর উঠতে চাইবে না।
ফজু: (হাসতে হাসতে পিঠ চাপড়ায়) পাগল
বুধা: রাতের বেলা ওরা বাঙ্কারে শুয়ে হাউইবাজি দেখবে। আহা রে আমি যদি এই বাঙ্কারে থাকতে পারতাম।
ফজু: (ফিসফিস করে) আল্লাহ মাফ করুক। এখানে থাকার ভাগ্য যেন আমাদের না হয়। এটা হলো ওদের কবর।
(বুধা ফজু মিয়ার পা ধরে সালাম করে ভোঁ দৌড় দেয়। ফজু মিয়া হতভম্ব)
দৃশ্য-২৪
(বুধা দৌড়াতে দৌড়াতে নদীর ধারে আসে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঝোপের ধারে লুকিয়ে থাকা শাহাবুদ্দিনের কাছে পৌঁছে যায় ও। শাহাবুদ্দিন ওকে জড়িয়ে ধরে)
শাহাবুদ্দিন: তোর উৎকণ্ঠায় আমি প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ।
বুধা: পুঁতে রেখে এসেছি। কোনো ভুল হয়নি। এই শব্দটা শোনার জন্য বসে থাকব।
শাহাবুদ্দিন: শাবাশ ছেলে। নে, মুড়ি খা।
(দুজনে মিলে গুঁড় মুড়ি খায়। নদী থেকে আঁজলায় পানি নিয়ে তিয়াষ মেটায়)
শাহাবুদ্দিন: বাঙ্কারকে সহজ করলে কী হয় বল তো?
বুধা: বাকার
শাহাবুদ্দিন: আর একটু ছোট করলে?
বুধা: বকার
শাহাবুদ্দিন: আর একটু ছোট
বুধা: বকর
শাহাবুদ্দিন: এবার মাঝখানের অক্ষরটাকে সামনে নিয়ে আয়
বুধা: কবর (উত্তেজিত হয়ে) বকর, বকর। কবর, কবর। শাহাবুদ্দিন ভাই ওদের কবর।
(মাইন বিস্ফোরিত হয়। শাহাবুদ্দিন বুধার হাত ধরে লাফিয়ে নৌকায় ওঠে। সন্ধ্যার অন্ধকার চারদিকে। আকাশে ফুটফুটি তারা।)
(বুধা নৌকার পাটাতনে পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। দু’হাত দু’দিকে লম্বা করে মেলে দিয়েছে। গায়ের জামাটি খুলে মাথায় বেঁধেছে। ঠিক কাকতাড়–য়ার ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। শাহাবুদ্দিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।)
শাহাবুদ্দিন: একটা গান গাইতে পারি না, জয় বাংলা?
বুধা: হ্যাঁ, তুমি গান গাও, আমি দেখি বাঘ-সিংহ আসে কি না
শাহাবুদ্দিন: ঠিক রে কাকতাড়–য়া-
সমাপ্ত
Design & Developed By Engr. Md. Jubayer Hossain (IT Coordinator) || Urvashi Forum || All Right Reserved www.urvashiforum.com
LeaveComment