• call Us: +8801713046073

আহ্বান || বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় || নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ || প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

আহ্বান || বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় || নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ || প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

আহ্বান

 বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

 নাট্যরূপ ও পরিচালনা: ড. মো. হারুনুর রশীদ

প্রযোজনা: উর্বশী ফোরাম

চরিত্র পরিচিতি

চক্রবর্তী: গ্রামের ধনী মানুষ ৫৫ বছর

গোপাল: কলকাতায় চাকরি করা যুবক, ৩৫ বছর

বুড়ি: মুসলিম বুড়ি, ৭০ বছর

হাজরা বেটার বউÑ ২৫ বছর

দিগম্বরী- ২৫ বছর

নাতজামাই-৩০ বছর

প্রতিবেশী-১

প্রতিবেশী-২

বীরেন

শুকুর আলী

নুরু

নাতজামাই

বন্ধু-১: ৩৫ বছর

বন্ধু-২: ৩৫ বছর

বন্ধু-৩: ৩৫ বছর

দৃশ্য: এক

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

চক্রবর্তী (ধুতি-ফতুয়া-নাগরা জুতা) গোপাল (পাঞ্জাবি-পাজামা) পুরোনো যুগের ট্রাভেল ব্যাগ

      (শহর থেকে একজন যুবক গ্রামে ফিরছেন। হাতে একটি ট্রাভেল ব্যাগ। একটি উঁচু ভাঙ্গা বাড়ির সামনে    কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারপর ধীরে ধীরে গ্রামে ঢোকে।)

গোপাল: এটা কি চক্রবর্তী মশায়ের বাড়ি?

চক্রবর্তী: তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলুম না বাবা।

গোপাল: আজ্ঞে আমি এই গ্রামেরই ছেলে। নরেশ বাড়–য্যের ছেলে। মা-বাবা মারা যাবার পর গ্রাম ছেড়ে শহরে গেছি। আর গ্রামে আসা হয়নি।

চক্রবর্তী: তার মানে তুমি আমার বাল্যবন্ধু নরেশ-এর ছেলে। (খুব খুশি হয়ে। গোপাল প্রণাম করে।) আরে থাক     থাক প্রণাম করতে হবে না। বেঁচে থাকো, দীর্ঘজীবী হও। দেখ দিকি কাণ্ড কত বড় হয়ে গেছ তুমি? আমি তো তোমাকে চিনতে পারিনি। এসো এসো ভেতরে এসো।

দৃশ্য: দুই

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

চক্রবর্তী (ধুতি-ফতুয়া-নাগরা জুতা), গোপাল (ফতুয়া-পাজামা পরা) পুরোনো আমলের কাঠের দুটো চেয়ার

      (চক্রবর্তী মশায়ের বাড়ি। চক্রবর্তী মশায়ের বৈঠকখানা। গ্রামের কিছু লোক গোপালকে দেখতে এসেছে)

চক্রবর্তী: তা এতোকাল পরে বুঝি মনে পড়ল তোমার দেশের কথা?

গোপাল: কাকাবাবু, পড়াশোনা শেষ করে কলকাতাতেই চাকরি পেয়ে গেলাম, খুব ব্যস্ত থাকি। মাঝে মাঝেই মনে হয় একবার গ্রামে আসি। মা-বাবার ভিটেটা দেখে আসি। সেই কৈশোরে গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় গেছি! খুব   মনে পড়তো গ্রামের কথা। এবার ছুটি বের করে একাই রওনা হলাম।

চক্রবর্তী: তা দেখলে তো তোমার পৈত্রিক বাড়িতে ভেঙ্গেচুরে ভিটিতে কেমন জঙ্গল গজিয়েছে?

গোপাল: তা দেখলাম খুড়োমশায়। মনটা খুব খারাপ হলো। আসলে দোষটা আমারই। মা-পিসিমা-বাবা মারা যাবার পর রেখে যাওয়া বাড়িটা রক্ষা করতে পারলাম না!

চক্রবর্তী: তা যাবার তা তো গেছেই গোপাল। তোমার বাবার ভিটেটা তো পড়েই আছে। এখন নতুন করে গ্রামে বাড়ি-ঘর করো। গ্রামে যাতায়াত করো।

গোপাল: আজ্ঞে সামান্য মাইনে পাই।

চক্রবর্তী: তাতে কী? গ্রামের ছেলে গ্রামে বাস করবে, তাতে আর সামান্য মাইনে বেশি মাইনে কী? আমি খড়-বাঁশ    দিচ্ছি চালাঘর তুলে ফেল। আহা! আমার বন্ধু নরেশের ছেলে, দেখেও সুখ। কদিনই বা আছি। বাস করো   গাঁয়ে।

প্রতিবেশী-১: ঠিকই বলেছে বাবা। গাঁয়ে একটা ঘর তুলে থাকো না আমাদের সাতে। গাঁয়ে শিক্ষিত্ মানুষের বড়ো        অভাব!

প্রতিবেশী-২: ঠিকই বলেছেন চক্কোত্তি মশায়। মোরা মুখ্যসুখ্য মানুষ বিদ্যা-বুদ্ধির বড়ো অভাব।

      গোপাল: আপনাকে খুব চেনা লাগছে, আপনি বীরেন কাকা না?

বীরেন: হ্যাঁ বাবা আমাকে চিনতে এতো কষ্ট হলো তোর?

গোপাল: চিনবো কি করে? সেই ছোট বেলা দেখেছি জোয়ান মানুষ। এখন একেবারে বুড়ো হয়ে গেছেন যে!

বীরেন: হ্যাঁরে বেটা তোর মতো শহরের খাবার পেলে আজও যুবক থাকতুম। (সবাই হেসে ওঠে)

 দৃশ্য: তিন

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (সাদা শাড়ি, গলায় তাবিজ) গোপাল (ফতুয়া, ধুতি)    বুড়ির থলে, বুুড়ির লাঠি

      (বড় আমবাগানের ভেতর দিয়ে গোপাল গ্রামের দিকে যাচ্ছে। পথে এক বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা। কুঁজো বুড়ি।     লাঠি ঠুক ঠুক করতে হয়তো বাজারের দিকে চলেছে। বগলে একটা ছোট থলে)

গোপাল: (¯^গত) কে এই বৃদ্ধা! কত মায়াবী চেহারা। নারীরূপের এক অপূর্ব পরিণতি! যেন ভারতচন্দ্র বর্ণিত   জরতিবেশিনী অন্নপূর্ণা!) (প্রকাশ্যে) কোথায় যাবে?

বুড়ি: বাজারে বাবাÑ(ভালো না দেখতে পেয়ে ডান হাত উঁচিয়ে তালু চোখের ওপর ধরে) কে বাবা তুমি? চেনলাম না তো?

গোপাল: চিনবে না। আমি বাড়–য্যেপাড়ার নরেশ বাড়–য্যের ছেলে। আমি অনেকদিন গাঁয়ে আসিনি।

বুড়ি: তা হবে বাবা। আমি তো আগে এপাড়া ওপাড়া যাতাম আসতাম না। তিনি থাকতি অভাব ছেল না কোনো   জিনিসের। গোলাপোরা ধান- গোয়ালপোরা গরুÑ

 গোপাল: তোমাকে তো চিনতে পারলাম না বুড়ি?

বুড়ি: আমার তো তেনার নাম করতে নেই বাবা। করাতের কাজ করতেন। আমরা মোছলমান বাবা। ওপাড়ায়   আমার বাড়ি।

গোপাল: তোমার ছেলে আছে?

বুড়ি: কেউ নেই বাবা, কেউ নেই। এক নাতজামাই আছে তো সে মোরে ভাত দেয় না। ওই আমার নাতনিকে রেখে মোর মেয়ে মারা যায়। আমার বড্ড কষ্ট। ভাত জোটে না সবদিন। বাজারে যাচ্ছি তিন পয়সার নুন কিনে আনবোÑদুটো ক’টা চাল যোগাড় করিচি ও বেলা।

      ( গোপাল বুড়িকে কিছু পয়সা বের করে দেয়। বুড়ি গোপালের দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে।) তুই    আমাকে কি ভেবে পয়সা দিলি বাবা? মোরা মুসলমান ম্লেচ্ছ, যবন।

গোপাল: পেটের ক্ষুধার কাছে হিন্দু- মোসলমান কোনো পার্থক্য নেই। ভগবানের কাছে সবাই সমান মানুষ।

বুড়ি: আমি আল্লাহর কাছে তোর জন্য নামাজ পইড়্যে দোয়া করব বাবা, তুই সুখে থাকিস। (বুড়ি চলে যায়)

দৃশ্য: চার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

চক্রবর্তী (দাদা গেঞ্জি ও ধুতি), গোপাল (দাদা গেঞ্জি, ধুতি)   একটা কাঠের চেয়ার, বুড়ির লাঠি

      ( সকালে গোপাল ঘুম থেকে উঠে চেয়ারে বসে আছে। চক্রবর্তী মশায়ের পেছন পেছন বুড়ি প্রবেশ করে)

চক্রবর্তী: গোপাল ঘুম থেকে উঠেছ? আমি ভাবলাম, শহুরে মানুষ। এখনও ঘুম থেকে ওঠার সকালে অভ্যাস কি     না।

গোপাল: খুড়ো মশায় আমি রোজ সকালেই ঘুম থেকে উঠি। সকাল নটার মধ্যে আফিসে যেতে হয়।

চক্রবর্তী: এই বুড়িটি তোমার জন্য ভোর থেকে এসে বাড়ির বাইরে বসে আছে।

গোপাল: ওহো এই বুড়ি। একে তো কাল আমবাগানের পথে দেখেছি। কিছু পয়সাও দিলাম।

চক্রবর্তী: ও হলো জমির করাতির স্ত্রী। অনেকদিন আগে মরে গিয়েচে জমির। তোমাদের খুব ছেলেবেলায়।

বুড়ি: (উঠোন থেকে। বোধহয় চোখে ভালো দেখতে পায় না) ও বাবাÑ

গোপাল: এই যে আমি এখানেÑ।

বুড়ি: কাল পয়সা ক’টা পেয়ে ভাবলাম যাই দিনি বাওন পাড়ার দিকি। কে পয়সা দিলে চিনতেও পারলাম না।     বিকেলবেলা চোখে ঠাহর পাইনে।

চক্রবর্তী: ওকে চিনতে পারনি? ও নরেশ বাড়–য্যের ছেলে গোপাল বাড়ুয্যেÑ

বুড়ি: হয়- চিনেছি, খুব ভাল মানুষ ছেলো। কোনোদিন আপন পর করেনি। কতদিন আমাদের বাড়িতে গিয়ে     বসেচে, চা-মুড়িও খেয়েছে। এজন্যেই বলি, মানুষ হতি হলি শিক্ষিত হতি হয়। নালি পরে জাত-পাত    করতি করতি বেবাদ করতি করতি জীবন নাশ হয়। আল্লা তোর ভালো করুক গোপাল।  কী বুঝে আমারে   তুই মোছলমান হয়েও পয়সা দিলি। আজ আমার ছেলে থাকলি তোর মতোই হতো, আমারে এমনি করেই   পয়সা দিত, মায়ের সাধ পেতুম। (বুড়ি চোখ মুছতে মুছতে চলে যায়)

দৃশ্য: পাঁচ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

চক্রবর্তী (পাঞ্জাবী-ধুতি), গোপাল (ফতুয়া-প্যান্ট) ট্রাভেল ব্যাগ

      (চক্রবর্তী মশায়ের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে গোপাল)

গোপাল: খুড়ো মশায় আসি তবে। কলকাতায় এলে অবশ্যই আমার সঙ্গে দেখা করবেন। আমার বাড়িতে এসে     উঠবেন। সংসার করিনি। কিন্তু ব্যাচেলর হিসেবেও সংসারের সবই আছে।

চক্রবর্তী: যাবরে একবার। কাশী যাওয়ার ইচ্ছা। কবে যে ভগবান মনোবাসনা পূর্ণ করবেন।

গোপাল: কলকাতা যাবার আগে আমায় একটা টেলিগ্রাম করবেন। আমি রেলস্টেশন থেকে আপনাকে নিয়ে    যাবো। আরেকটা কথা, এখানে কিছু টাকা আছে, আমার বাবার ভিটেটার ওপর একটা ঘর তুলে দেবেন।      আমি ওসবের জন্য সময় পাব না। ছুটি পেলে এখন থেকে গ্রামেই আসবো।

চক্রবর্তী: অবশ্যই। অবশ্যই। তা কবে আসবে তুমি?

গোপাল: জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমের ছুটিতে আসবো। যাই তবে নমস্কার।

চক্রবর্তী: নমস্কার! নমস্কার।

দৃশ্য: ছয়

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

 গোপাল (দৃশ্য পাঁচ-এর ফতুয়া-প্যান্ট)    ডাংগুলি খেলার জিনিসপত্র। ট্রেনে চলাচল। গ্রামের ছেলেদের খেলার দৃশ্য ধারণ।

      (গোপাল ট্রেনে ভ্রমণ করছে। তার কল্পনায় ভাসছে ছেলেবেলার স্মৃতি। কতগুলো ছেলেমেয়েকে উঠোনে     খেলতে দেখা যাবে। মা এসে সবাইকে বাড়ি যেতে বলবেন। ছেলে দৌড়ে পালাবে। গোপাল মায়ের-বাবা কথা ভেবে চোখ মোছে)

      (আবার ট্রেন দেখা যায়। গোপাল উল্টো দিক থেকে আসছে)

দৃশ্য: সাত

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (সাদা শাড়ি) গোপাল (ধুতি-ফতুয়া) নতুন তৈরি খড়ের ঘর। টিপাই একটা। কিছু পাকা আম

      (নতুন তৈরি একটি খড়ের ঘর। গোপাল বারান্দায় টিপাইয়ে বসা। বুড়ি এসে মাটির বারান্দায় বসে)

গোপাল: কি বুড়ি ভাল আছো?

বুড়ি: (শাড়ির আঁচল থেকে আম খুলতে খুলতে) আমার কি মরণ আছেরে বাবা!

গোপাল: ও আম কিসের?

বুড়ি: (দন্তহীন মুখে হাসার চেষ্টা করে) ও গোপাল আমার। তোর জন্যি নিয়ে আলাম। গাছের আম, বেশ কড়া মিষ্টি। খেয়ে দেখো এখন।

      (গোপাল কৌতুকচ্ছলে যেন হাসে)

বুড়ি: তা নতুন ঘরে এসে উইঠ্লে। রাঁধা-বাড়ার তো কোনো আয়োজন দেখিনে। খাও কোথায় হ্যাঁ বাবা?

গোপাল: খুড়ো মশায়ের বাড়ি

বুড়ি: বেশ যতœ করে তো ওনারা?

গোপাল: তা করেÑ

বুড়ি: দুধ পাচ্ছ ভালো?

গোপাল: ঘুঁটি গোয়ালিনী দেয়, মন্দ না।

বুড়ি: ও বাবা, ওর দুধ! আদ্ধেক জল। দুধ খেতি পাচ্ছ না ভালো সে বুঝিচি। আজ যাই বাবা দেখিগে কোথায় কি     পাই। (বুড়ি চলে যায়)

দৃশ্য: আট

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (পাড় দেওয়া সাদা শাড়ি), গোপাল (দাদা গেঞ্জি, ধুতি)  সূর্যোদয় ও মোরগ ডাকার দৃশ্যধারণ, একটা দুধের ঘটি

      (সূর্যোদয় দেখানো হবে। মোরগের ডাক শোন যাবে। বাইরে থেকে বুড়ির ডাক শোনা যাবে। গোপাল    বিছানায় শুয়ে ডাক শুনতে পাবে)

বুড়ি: ও গোপাল, অ গোপাল, এখনও ঘুমিয়ে যাচ্ছোÑ

গোপাল: আরে এত সকালে কি মনে করে? হাতে কি?

বুড়ি: (হাতের নড়ি বারান্দার গায়ে ঠেস দিয়ে রাখে) এক ঘটি দুধ আনলাম তোর জন্যি।

গোপাল: সে কি! দুধ পেলে কোথায় এত সকালে?

বুড়ি: আমায় মা বলে ডাকে ওই হাজরা বেটার বউ। তার কেউ নেই। মোর চালাঘরের পাশে ওর চালাঘর। ওরে     কাল রাত্তিরে বলে রেখে দিয়েছিলাম, বলি বউ, আমার গোপাল দুধ খেতি পায় না। সকালে চা না কি    খায়। ওরে খুব ভোরে উঠে গাই দুয়ে দিতে হবে। তাই আজ কুঁকরো ডাকা ভোরে উঠে দেখি আমারে     ডাকচে। ‘মা ওঠো, তোমার গোপালের জন্যি দুধ নিয়ে যাও।’

গোপাল: আচ্ছা কেন বলতো তোমার এসব? ছিঃ না এসব ভাল না। (¯^গত: মুসলমানের দুধ ব্রাহ্মণের ঘরে।    কোনদিক থেকে কে দেখে ফেলবে। মান-সম্মান সব যাবে।) এরকম আর কখনও এনো না। কত পয়সা   দাম দিতে হবে বলো। কতটা  দুধ?

বুড়ি: কেন বাবা, বাবা পয়সা কেন?

গোপাল: পয়সা নাতো তুমি দুধ পাবে কোথায়?

বুুড়ি: ওই যে বল্লাম বাবা, আমার মেয়ের বাড়ি থেকে।

গোপাল: তা হোক, তুমি পয়সা নিয়ে যাও। সেও তো গরিব লোক। (পয়সা দেয়। বুড়ি কাঁপা হাতে টাকা নেয়। মুখ ভার করে হনহন করে লাঠি ঠকঠক করতে করতে বেরিয়ে যায়।)

গোপাল: (¯^গত) আহা! বুড়িটাকে এমন করা ঠিক হলো কি? পয়সা দেওয়াটাÑ। ¯েœহের দান এমন করা ঠিক হয়নি। কেমন দমে গিয়েছে বুড়িটা আজ। জানি না আর আমার ঘরের দিকে আসবে কি না!

 দৃশ্য: নয়

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (সাদা শাড়ি) গোপাল (ধুতি-ফতুয়া) শসার ক্ষেত।

      (সকাল বেলা বুড়িকে জালি থেকে শসা তুলতে দেখা যায়। এরপর ঠুকঠুক করে গাঁয়ের পথ ধরে হাঁটে।   গোপাল আঙিনায় বসা)

বুড়ি: অ গোপালÑ এই দুটি কচি শসার জালি মোর গাছের। এই ন্যাও। নুন দিয়ে খাও দিকিনি মোর সামনে।

গোপাল: বুড়ি তোমার চলে কিসে?

বুড়ি: নাতজামাইয়ের দেবার কথা। তা সে সবদিন দেয় না। ওই যারে মেয়ে বলি সে বড্ড ভালো। লোকের ধান    ভানে। তাই চাল পায়। আমারে দুটো না দিয়ে খায় না।

গোপাল: একা থাকো?

বুড়ি: তা একদিন মোর ঘরখানা না হয় দেখতি গেলে, অ মোর গোপাল। আমি নতুন খাজুর পাতার চেটাই বুনে রেখে দিয়েলাম তোমারে বসতি দেবার জন্যি। বাউনের ছেলে, মোদের মোসলমানের এঁটোকাঁটা মাদুরে   কি বসবে? তাই বলি একটা নতুন চেটাই বুনে রাখি, যখন আসবে এখানেতেই বসবে।

গোপাল: আচ্ছা যাব একদিন, এবার বোধহয় হবে না। পরেরবার এলে যাব।

বুড়ি: যাস বাবা, যদি বেঁইচে থাকি।

দৃশ্য: দশ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (সাদা শাড়ি, চাদর পরা), গোপাল (ফতুয়া-ধুতি-চাতর) রান্নার বড় ডেগ দুই তিনটা। চুলা। লাকড়ি। একটা নতুন শাড়ি, পাকা পেঁপে

      (গোপালের ঘরের সামনে বেশ সাজানো ভাব। একটা রান্নাঘরের সামনে কিছু রান্নার আয়োজন করছে   একদল মানুষ।)

      (বুড়ি এসে দাঁড়ায়।)

বুড়ি: অ গোপাল, আজ বাড়িতে খুব ধুমধাম মনে হচ্ছে। বিয়ে-শাদি কিছু আয়োজন করতিছ, নাকি?

গোপাল: না বিয়ে নয়, কলকাতা থেকে কয়েকজন বন্ধু আমার গ্রাম দেখতে আসবে।

বুড়ি: ও তাই বুঝি একটা বউ হলে এতো কষ্ট হতো তোমার?

গোপাল: কেন আসো রোজ রোজ অতদূর থেকে?

বুড়ি: এই পাকা পেঁপেডা ভাবলাম গোপালেরে দিয়ে আসিÑ

গোপাল: তা হোক- তুমি কষ্ট করে এসো না এরকম।

বুড়ি: তুই তো আমাকে দেখতে যাবিনে কোনো দিন।

গোপাল: সময় পেলেই যাব। এখন বাড়ি যাও।

বুড়ি: অ গোপাল তুই বিয়ে করলি নে কেন?

গোপাল: মেয়ে পাওয়া যায় না। তাছাড়া বয়স হয়ে গিয়েচে।

বুড়ি: কিছু বয়স হয়নি। কাঁচা ছেলে তোমরা। ওই মুখুয্যেদের বাড়ি একটা বড় মেয়ে আছে, তোমার সঙ্গে মিল হবে। বলে দেখবানি ওদের।

গোপাল: আমার ঘটকালি করবার লোকের যখন দরকার হবে, তখন তোমায় ডেকে পাঠাবো। এখন যাও। আর শোন, দাঁড়াও। (একটা শাড়ি এনে বুড়িকে দেয়) এই নাও একটা কাপড়। কলকাতা থেকে এনেছি। (বুড়ি চোখ মুছতে মুছতে কাপড় নিয়ে চলে যায়)

দৃশ্য: এগার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (শাড়ি-চাদর), বউ (আঁচলসহ মোটা থানের শাড়ি) চিড়া কোটার ছাম-গাইন

      (হাজরা বেটার বউয়ের বারান্দা। ছাম-গাইনে চিড়া কুটছে)

বউ: কনে যাচ্ছ মা?

বুড়ি: ও কি কুটচিস?

বউ: কামিনী সরু ধানের ভালো চিড়ে। তোমার গোপালের জন্যি দুটো নিয়ে যেও এখন, কাল বেন বেলা। আমারে     একদিন নিয়ে যেও মা। তোমার ছেলেরে দেখতি মন চায়।

বুড়ি: নিয়ে যাবানে। কিন্তু হাজরা বেটাকে বলিস, হিঁদু পাড়ায় তোকে যেতে দেয় কি না।

বউ: বইলে দেখবানে- কী বলেÑ

দৃশ্য: বার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বুড়ি (শাড়ি-চাদর), গোপাল (ধুতি ফুতয়া-শাল), বন্ধু-১ (ধুতি-ফতুয়া-চাদর), বন্ধু-২ (ধুতি- মোটা গাউন), বন্ধু-৩ চাদর-ধুতি), চক্রবর্তী (ধুতি-পাঞ্জাবী-শাল) চিড়ের পোটলা

      ( গোপালের বন্ধুরা তিনজন বসা। বুড়িকে দেখে গোপাল ভড়কে যায়।)

বুড়ি: অ মোর গোপাল ঘরে আছিস নাকি?

গোপাল: (বিরক্তির সঙ্গে) হ্যাঁ কেন?

বুড়ি: এই এয়েলাম। বলি যাই গোপালকে দেখে আসি একবার।

বন্ধু-১: ও কে হে?

গোপাল: (চাপা দেবার চেষ্টা  করে) ও এমনি গাঁয়ের লোক।

বন্ধু-২: তোমার ডাকনাম কি গোপাল না কি হে গ্রামে?

গোপাল: (ইতস্তত) হ্যাঁÑনা-এইÑ

বুড়ি: কাল রাত্তিরে কি গরম পড়ল। গোপাল ঘুমুতে পেরিলি কাল? মুই চোখ বুজিনি সারারাত।

গোপাল: বেশ করনি!

বন্ধু-৩: ও গোপাল বলছে কাকে হে?

গোপাল: ইয়ে-হ্যাঁÑআমাকেই বলচেÑ(দুটো আঙুল দেখিয়ে ইঙ্গিত করে) ওর মাথাটা একটুÑ বুঝলে না

বন্ধু-১: ও বুঝেচি, বুঝেচি (সবাই হেসে ওঠে)

গোপাল: আজ যাওÑ। বড্ড ব্যস্ত আছি বুঝলেÑকলকাতার বন্ধুরা সব এসেছেন হ্যাঁÑ

বুড়ি: আজ কি এনেচি বলো দেখি গোপাল? (বুড়ির পেছনে লুকানো পোটলা বের করে)

      এই দেখোÑভালো ধানের চিড়ে, দুধ-কলা দিয়ে বেশ করে খাবি।

গোপাল: এখন যাও না। দেখছো না ব্যস্ত আছি?

বুড়ি: চিড়ে কটা নেবার জন্যি একটা কিছু দেও বাবা।

গোপাল: ওসব এখন নিয়ে যাও। হ্যাঁ হ্যাঁ পরে হবে। এখন যাওÑ

বুড়ি: তা চিড়ে কটা? (চক্রবর্তী মশায়কে আসতে দেখা যায়।)

গোপাল: (¯^গত) এই সেরেছে। খুড়ো মশায় দেখে ফেললে ও বাড়িতে আমার খাবার বন্ধ করে দেবে।

চক্রবর্তী: কী ওতে? কী বলচে জমিরের স্ত্রী?

গোপাল: কিচ্ছু নাÑইয়ে বিক্রি করতে এসেছে। যাও এখন।

বুড়ি: আমি পয়সা নেবো না গোপালÑ

চক্রবর্তী: তোমার এখানে ওর বড্ড যাতায়াত।

গোপাল: ইয়ে খুড়োমশায়Ñআমার এই বন্ধুরা একদিন পল্লির গান শোনার কথা বলছিলেন। তা আজ-কালে কি    একটা  গানের আসর বসানো যায়?

চক্রবর্তী: হুম্ । আমি বললে তো হতেই পারে। বলে দেখি দু’পাড়ার গাতকদের-

দৃশ্য: তের

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

সন্ধ্যায় গ্রামীণ গানের আসর বসেছে। গাঁয়ের অনেক মানুষ বসা। চেয়ারে বসা চক্রবর্তী বাবু, গোপাল ও তার তিন বন্ধু। একটা টিপাইয়ে বসা বুড়ি

গান গাইবে-বীরেন, শুকুর আলী, নাতজামাই  ঢোল-ঢাক-বাঁশি

শুকুর আলী: বাবুগণ আমরা এ-গ্রামে দুই পাড়ায় আমাদের সাত পুরুষ আগে থেকে হিন্দু-মুসলমান মিলে মিশে    আছি।

বীরেন: আমার জন্মই হয়েছে এ গ্রামে কখনো আমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি। ধর্ম নিয়ে কখনো ঝগড়া    করিনি। আমরা দুই পাড়ার মানুষ ভাই-ভাইয়ের মতো বসবাস করতেছিÑসৃষ্টিকর্তার চোখে আমরা সবাই    সমান মানুষ।

নাতজামাই: বাবু মশায়গণ এই বিষয়ডা নিয়ে আজকে আমরা একটা গীতি গাইবো। ভুল-ত্রæটি মার্জনা করবেন   বাবু-

আহŸান

ওগো মা, ওগো মা, তোমার নেই যে উপমা

ভুবন আমার জন্মভ‚মি, দেশ আমার মা

মায়ের চোখে সবাই সমান তফাৎ দেখি নাÑ

ওগো মা, ওগো মা, তোমার নেই যে উপমা

জাত-পাতের বিভেদ বোঝা চেনা বড় দায়

আকাশ হতে সবাই সমান দেখ যদি তায়

বিধির চোখে সবাই সমান বিভেদ দেখি নাÑ

ওগো মা, ওগো মা, তোমার নেই যে উপমা।

ঝগড়া  নাহি করে কভু ¯্রষ্টা-ভগবান

হৃদয় দিয়া পরস্পরে করো আহŸান

মনের ভেতর যে ঘর থাকে নেই যে তুলনা-

ওগো মা, ওগো মা, তোমার নেই যে উপমা।

মায়ের ধর্ম অন্তরে ভাই করো হে লালন

আত্মা নাহি মানে তখন ধর্ম বিভাজন।

সবার মাঝে খুঁজে নে তোর আপন ঠিকানাÑ

ওগো মা, ওগো মা, তোমার নেই যে উপমা

                        Ñগীতিকার: ড. মো. হারুনুর রশীদ

দৃশ্য: তের

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

নুরু (লুঙ্গি, দাদা গেঞ্জি, তাবিজ), গোপাল (প্যান্ট-ফতুয়া)   নাই

      (গোপাল রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিল। নারু গোপালকে দেখে থামায়)

নুরু: ও দাদাঠাকুর। আমায় চিনতে পেরেছো? আমি মুখুয্যেবাড়ির নুরু, ছেলেবেলা থেকে ও বাড়িতে কাজ করছি-

গোপাল: হ্যাঁ চিনেছি। কী কথা বলো নুরু

নুরু: আজ জমির করাতির বউ-বুড়ি বাড়ির মেয়েদের কাছে গিয়ে বলচে কি, গোপালের সঙ্গে তোমাদের পুঁটির   বিয়ে দাও। মেয়েরা তো শুনে অবাক, গোপাল কে? শেষে জানা গেলÑ তুমি। ওরা তো শুনে আশ্চর্য। তা    তুমি বুড়িকে কিছু বলেছিলে নাকি এ সম্বন্ধে?

গোপাল: (অসহায় হয়ে) সে কি কথা! কক্ষনো না। তুমি বিশ্বাস করোÑ

নুুরু: না না বিশ্বাস অবশ্যি করিনি।যদি কিছু করেও থাকে বুড়িকে বারণ করে দেবে আর না বলে। গ্রাম ভালো নয়,   ও নিয়ে মেয়েটার নামে একটা কথাকথি যদি হয়।

গোপাল: নিশ্চয়। তুমি বিশ্¦াস করো ভাই। আমি এর বিন্দুবিসর্গও জানিনে।

দৃশ্য: চৌদ্দ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

 গোপাল (দাদা গেঞ্জি ও প্যান্ট) বাতাবি লেবু

      (গোপালের সামনে বুড়ি বসা)

গোপাল: কে তোমাকে করতে বলেছে এসব কাণ্ড? তোমাকে ঘটকালি করতে ডেকেছিলাম? গাঁয়ে এই নিয়ে শেষে   একটা কথা উঠবে। পাড়াগাঁ জায়গা খারাপ। তুমি বাপু এখানে আর এসো না।

বুড়ি: (ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে) বকিসনে অ গোপাল মোরে বকিস নে। তা তুই ও মেয়েডারে বিয়ে না     করিসÑ অন্য কোনো মেয়ে বিয়ে কর। পুঁটিরে তোর পছন্দ হয়নি না?

গোপাল: (ধমকে) আবার ওই সব কথা!

বুড়ি: যাই বাবা, একটা বাতাবী নেবু নিয়ে এয়িলাম তোমার জন্যিÑ

গোপাল: দরকার নেই বাতাবী নেবুতে যাও এখনÑ(বুড়ি কাঁপতে কাঁপতে উঠে চলে যায়)

                        (ছয় মাস পর। আশ্বিন মাসের শেষে)

দৃশ্য: পনের

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বউ (নকশা শাড়ি। গায়ে চাদর) গোপাল (প্যান্ট-দাদা গেঞ্জি)  নাই

      ( গোপাল ঘরে বসে আছে। বাইরের উঠোনে দাঁড়িয়ে হাজরা বেটার বউ ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকে)

বউ: বাবু ঘরে আছেন গা?

      (বাইরে বেরিয়ে আসে গোপাল)

বউ: (মাথায় সলজ্জভাবে কাপড়টা টেনে দেবার চেষ্টা করে বলে) বাবু কবে এসেছেন?

গোপাল: দিন পাঁচ-ছয় হলো। কেন?

বউ: আমার সেই মা পেটিয়ে দিলে। বললো দেখে এসো গিয়ে।

গোপাল: কে? ও সেই বুড়ি? এখানে যিনি আসতোÑ?

বউ: তেনার বড্ড অসুখ। এবার বোধহয় বাঁচবে না। গোপাল কবে আসবে, গোপাল কবে আসবে। অস্থির,   আমারে রোজ শুধায়। আমি বলি, তিনি কলকাতায় চাকরি করেন, সবসময় কি আসতে পারেন? কি মায়া   আপনার ওপর? আর জন্মে মনে হয় পেটে ধরেল। একবার দেখে আসুন গিয়ে, বড্ড খুশি হবি তাহলিÑ

গোপাল: (উদাসীনভাবে) ও!

বউ: ও বেলা একবার যাবেন বাবু?

গোপাল: আচ্ছাÑতাÑএখন ঠিক বলতে পারচিনেÑআমি আমার দুই বন্ধুর কাউন্সিলের ইলেকশনে ভোট চাইতে     এসেছি এবার। সময়ের বড় অভাব।

বউ: (অনুনয় করে) একবার যাবেন বাবু ওবেলা। হয়তো বুড়ি বাঁচবে না।

দৃশ্য: ষোল

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

বউ (নকশা শাড়ি) বুড়ি (সাদা শাড়ি), শুকুর আলী   কাঁথা। মলিন বালিশ। মাদুর একটা। পিঁড়ি একটা। খেজুর পাতার চট একটা

      (বুড়ির পাঁচচালা ঘর। খড় উড়ে পচেছে। চালা থেকে দড়ি ঝুলে পড়েছে। মাটির বারান্দা নানা স্থানে ভাঙা। বাঁশের খুঁটি নড়বড়ে)

      (বুড়ি শুয়ে আছে একটা মাদুরের ওপর। মাথায় তেলচিটে মলিন বালিশ)

বউ: অ-মা কে এয়েচে দেখো অ-মা

বুড়ি: (চোখ খুলে ধড়মড় করে ওঠার চেষ্টা করে)

গোপাল: উঠো না, উঠো না, ও কি!

বুড়ি: (আহ্লাদে আটখানা হয়ে) ভালো আছো আমার গোপাল? বসতে দে গোপালকে বসতে দেÑ

গোপাল: বসবার দরকার নেই। ব্যস্ত হয়ো না। থাক্Ñ

      (বউ একখানা পিঁড়ি এগিয়ে দিতে যায়)

বুড়ি: ওখানা কেন দিচ্চিস? গোপালেরে ওই খাজুরের চটখানা পেতে দেÑ(খাজুরের চট এনে দেয় হাজরা বেটার    বউ। অনুযোগের সুরে বলেÑ) তোর জন্যি খাজুরের চটখানা কদ্দিন আগে বুনে রেখেলাম। ওখানা   পুরোনো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে। তুই একদিনও এলি না গোপাল। অসুখ হয়েচে তাও দেখতে এলি নাÑ

গোপাল: আচ্ছা চুপ করে শুয়ে থাকো, ব্যস্ত হয়ো না। (পাড়ার অনেক লোক এসে জমা হয়।)

শুকুর আলী: বুড়ি কেবল তোমার কথা বলে বাবা। তোমাকে দেখবার বড্ড ইচ্ছে। এবার বোধহয় আর বিছানা ছাড়বে না।

বুড়ি: গোপাল, যদি মরি, আমার কাফনের কাপড় তুই কিনে দিসÑ

গোপাল: সে কি?

শুকুর আলী : জানো না না বাবু? আমাদের ধর্মে মাটি দেবার সময় নতুন কাপড় পরিয়ে দিতে হয়Ñ

গোপাল: ও বুঝেচি।

      (হাজরা বেটার বউকে ডেকে কিছু টাকা দেয়) ওর ভালোভাবে চিকিৎসা করাবেন। ডাক্তার কোবরেজ যা    লাগে খরচ করবেন। এই নিন, কিছু টাকা, আশা করি ওটায় হয়ে যাবে। আমি এবার কলকাতায় গেলে   আর আসব কিনা জানি না। যদি কোনোদিন আসি, ওকে যেন ভালো দেখতে পাই। ভগবান যেন ওকে ভালো রাখেন। (চলে যেতে উদ্যত হয়)

বউ: জ্বি বাবু। (গোপাল চলে যায়)

                                    ( দেড় বছর পর)

দৃশ্য: সতের

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

দিগম্বরী (নকশা শাড়ি)  ট্রাভেল ব্যাগ

      (গ্রামে ঢুকতেই দেখা পরশু সর্দারের বউ দিগম্বরীর সঙ্গে)

দিগম্বরী: ও-মা বাবা ঠাকুর যে!

গোপাল: কেমন আছো দিগম্বরী? তোমার পরশুরাম ভালো আছে তো?

দিগম্বরী: ভালো আছি বাবা ঠাকুর। আজই তুমি এলে? সে বুড়ি যে কাল রাতে মারা গিয়েছে। তোমার নাম করলে     বড্ড। ওর সেই পাতানো মেয়ে আজ সকালে বলছেল।

গোপাল: তাই নাকি! মারা গিয়েছে? (¯^গত) ওর ¯েœহাতুর আত্মার ডাক বহুদূর বারাণসী থেকে আমায় আহŸান   করে এনেছে। ওর ডাক আমার মন আর তাচ্ছিল্য করতে পারেনি। (হেঁটে যায় ঘরের দিকে)

দৃশ্য: আঠার

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

নাতজামাই (লুঙ্গি পরা, ফতুয়া, গলায় ও হাতে তাবিজ)  তাবিজ

      (নাতজামাই দাঁড়িয়ে। গোপাল কিছু টাকা দেয়)

গোপাল: এই টাকা দিয়ে সবচেয়ে ভালো কাফনের কাপড়টা কিনবেন। আর যা যা লাগে সব আয়োজন করবেন।     মাটি হবে কোথায়?

নাতজামাই: ওই ঊঁচু ভিটার তিত্তিরাজ গাছের তলায় বাবু। মাটি দেবার সময় একবার যাবেন। বেলা বারোটা    আন্দাজ যাবেন।

গোপাল: যাব? কোনো মুসলমান আপত্তি করবে না তো?

নাতজামাই: না বাবু, ওরকম গোঁরা মুসলিম আমাদের গাঁয়ে নেই।

গোপাল: ঠিক আছে যাবোÑ

দৃশ্য: উনিশ

চরিত্র ও সাজসজ্জা  প্রপস্/ জিনিসপত্র

শুকুর মিয়াসহ সবাই (লুঙ্গি, ফতুয়া, টুপি পরা), গোপাল (পাজামা ও ফতুয়া পরা) গরুর গাড়ির কাঠামো। কোদাল। কাঁথা। সাদা কাপড়

      (একটা গরুর গাড়ির পুরোনো কাঠামোর ওপর বৃদ্ধাকে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে। দুজন জোয়ান   ছেলে কবর খুঁড়ছে। গাছের ছায়ায় বসা আবদুল, শুকুর মিয়া, নসর, আবেদালি, গনি। দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল গোপাল)

শুকুর মিয়া: এই যে বাবাঠাকুর এসো।  (গোপাল কাছে এসে বসে) বুড়ির মাটি দেবার দিন তুমি কনে থেকে এলে,    তুমি ত জানতে না। তোমায় যে বড্ড ভালোবাসতো বুড়ি। তোমার কাছে কাফনের কাপড় নিয়ে তবে ওর মহাপ্রাণীডা ঠাণ্ডা   হলো।

      (কবরে মাটি দেওয়া শুরু হলো)

শুকুর মিয়া: দ্যাও বাবাঠাকুর, তুমিও দ্যাও। দ্যাও এক কোদাল মাটি। তুমি দিলে ওর মহাপ্রাণীডা ঠাণ্ডা হবেÑ

      (এক কোদাল মাটি তুলে দেয় গোপাল)

গোপাল: (¯^গত) এখন যদি ও বেঁচে থাকতো, নিশ্চয় বলে উঠতোÑ ‘অ মোর গোপাল’। (যেতে যেতে ভাবে)     একটা কবর দিলাম আজ। না, সেই বুড়ির কবর নয়, আমার আত্মার সাম্প্রদায়িকতার কবর দিলাম। ভিন্নধর্মী হয়েও আমি যাঁর সন্তান হয়ে উঠেছিলাম, মা হয়ে যে আমার সকল তাচ্ছিল্য সহ্য করেছিল, সেই   মা-কে তুলে রাখলাম চিরন্তন মায়ের স্থানে। এই মায়েরা কবরে ঘুমাবে না, এই মায়েদের স্থান মহীয়সীর   স্থানে। কারণ মায়েদের কোনো ধর্ম হয় কি? তাদের একেকজনের ধর্ম যদি একেক হতো তাহলে সব মায়েরা এতো সহনশীল কেন? এতো ¯েœহাতুর কেন? সব মা একই রকম কেন?

(খালি কন্ঠে সেই গানটি বেজে উঠবে- ওগো মা, ওগো মা তোমার নেই তে উপমা-ভুবন আমার জন্মভ‚মি দেশ আমার মা। মায়ের চোখে সবাই সমান তফাৎ দেখি না।…)

সমাপ্ত

  • Prev Post
  • Next Post

LeaveComment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »