• call Us: +8801713046073

Drama

স্নেহপ্রীতির বাঁধনে ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যেও যে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে তার উত্তম দৃষ্টান্ত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ‘আহ্বান’। একজন মুসলিম দরিদ্র বুড়ি স্নেহচ্ছায়ায় একজন হিন্দু যুবককে সন্তানের আসন দিয়েছে। বুড়ি এখানে হয়ে উঠেছেন চিরায়ত মা। গল্পের শেষে বুড়ির দাফনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক চেতনার কবর রচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ চিন্তার মূলে কুঠারাঘাত করার জন্য এধরনের গল্পের মূল্য অনন্য।

এই ‘আহ্বান’ নিয়েই নির্মিত হয়েছে নাটক। গল্পটির নাট্যরূপ এবং পরিচালনা করেছেন ড. মো. হারুনুর রশীদ। গল্পের কালগত দৃশ্যায়নের প্রয়োজনে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৃশ্যধারণ করা হয় গত মার্চ মাসে। একটি দৃশ্য বাকি থাকায় করোনার লকডাউনে কাজ স্থগিত ছিল। গত ১২ আগস্ট পুবাইলে বাকি অংশের শুটিং সম্পন্ন হয় বলে জানান পরিচালক।

নাটকটির মূল চরিত্রে বুড়ি মার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেত্রী দিলারা জামান। এ ছাড়াও রয়েছেন সুজাত শিমুল  মারিয়া হক, নুসরাত ওয়ামিয়া, হারুনুর রশীদ প্রমুখ। নাটকটির প্রযোজনা করেছে উর্বশী ফোরাম।

https://samakal.com/entertainment/article/200833560/%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9B%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%9F%E0%A6%95-%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8

—————————————————————————————–

বিভূতিভূষণের ‘আহ্বান’ গল্পে নাটক

অনলাইন ডেস্ক

১৪ আগস্ট, ২০২০ ১৩:০৪ | পড়া যাবে ১ মিনিটে

বিভূতিভূষণের ‘আহ্বান’ গল্পে নাটক

স্নেহপ্রীতির বাঁধনে ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যেও যে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে তার উত্তম দৃষ্টান্ত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ‘আহ্বান’। একজন মুসলিম দরিদ্র বুড়ি স্নেহচ্ছায়ায় একজন হিন্দু যুবককে সন্তানের আসন দিয়েছে। বুড়ি এখানে হয়ে উঠেছেন চিরায়ত মা। গল্পের শেষে বুড়ির দাফনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক চেতনার কবর রচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ চিন্তার মূলে কুঠারাঘাত করার জন্য এধরনের গল্পের মূল্য অনন্য।

এই ‘আহ্বান’ নিয়েই নির্মিত হয়েছে নাটক। গল্পটির নাট্যরূপ এবং পরিচালনা করেছেন ড. মো. হারুনুর রশীদ। গল্পের কালগত দৃশ্যায়নের প্রয়োজনে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৃশ্যধারণ করা হয় গত মার্চ মাসে। একটি দৃশ্য বাকি থাকায় করোনার লকডাউনে কাজ স্থগিত ছিল। গত ১২ আগস্ট পুবাইলে বাকি অংশের শুটিং সম্পন্ন হয় বলে জানান পরিচালক।

নাটকটির মূল চরিত্রে বুড়ি মার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেত্রী দিলারা জামান। এ ছাড়াও রয়েছেন সুজাত শিমুল  মারিয়া হক, নুসরাত ওয়ামিয়া, হারুনুর রশীদ প্রমুখ। নাটকটির প্রযোজনা করেছে উর্বশী ফোরাম।

https://www.kalerkantho.com/online/entertainment/2020/08/14/945329?fbclid=IwAR2YAOEaqFodb2U9lZpZQ8zL23L1qOyrduLcpQpNCR09O1iVY0-YoAwmZV4

——————————————————————————————————————–

মাসি-পিসি
মূল গল্প: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
নাট্যরূপ: ড. মো. হারুনুর রশীদ

শোন জামাই, আর কতা বাড়াইও না, আমি কই তুমি না হয় আর কটা দিন থাকি যাও। এই অবস্তায় মেয়াটাক পাটালি ওর শরীল সইতি পারবি না বাবা।

চরিত্র:
১. মাসি- ৪৫-৫০ বছর
২. পিসি- ৪৫-৫০ বছর
৩. আহ্লাদি- ২০-২৫ বছর
৪. জগু (আহ্লাদির স্বামী) -৩০-৩৫ বছর
৫. কৈলাস -৩০ বছর
৬. কানাই চৌকিদার -৪০ বছর
৭. বুড়ো রহমান- ৫৫ বছর
৮. গোকুল জমিদার
৯. যুবক- ২ জন
১০. কনস্টেবল
১১. পিয়াদা
১২. লোক ২জন

(একটি হিন্দু-গ্রাম। একটি দরিদ্র পরিবারের ছোট্ট ঘর। এক ঘরে বাবা-মা ভাই-বোন সকলের বাস। গ্রামের চতুর্দিকে হাওর-বাওর, বিল। গ্রামের পাশ দিয়ে একটি খাল বয়ে গেছে। দূরে দূরে এক-একটি গ্রাম দেখা যায়। নৌকা নিয়ে যাতায়াত করতে হয়।)
দৃশ্য : ১
(গ্রামীণ পুকুর থেকে আহ্লাদি কলসে করে পানি নিতে আসে। অন্য একজন মহিলাও আসে। )
মহিলা: ও আহ্লাদি, তোমাকে বলি কি এই সময় ভারি জিনিস তোলা ঠিক না। তুমি তো কথা শোন না। তোমার পেটে চার মাসের সন্তান। এ সময়টায় খুব সাবধান থাকতি হয়।
আহ্লাদি: কী করবো বল কাকিমা। যার সাথে বিয়ে হয়েসে, আস্ত একটা পাষÐ। এখনি বাড়িত আসবে। খাবার না পালি ঘা মেরে জীবন রাখপি না নে।
মহিলা: হ, তুই বড়ো ল²ী মেয়েরে-। না-হলে ওই দুষ্ট জগুর সংসার কেউ করে? এতো করেও মানিয়ে নিচ্চিস। আচ্ছা আহ্লাদি তোর বাপের ঘরে চলে যেতে পারিসনে?
আহ্লাদি: সেই দিন আর নেইগো কাকিমা। মোদের গ্রামে দুর্ভিক্ক নেগেচে। না খেয়ে মরচে কত মানুষ! আমার বাবা থাকার ভিটেটুকু রেকে সব বেচে দিয়েচে। ওদিকে গ্রামে নাকি কলেরা নেগে মানুষ মরচে। বাবা খবর পাটিয়েচে আমি যেন না যাই। তাই মরি-বাঁচি এই বদ লোকটার সঙ্গেই থাকতে হবে গো।
মহিলা: আহ্লাদি, তোর কাঁধের নিচে ওই দাগটা কিসের কদিকিনি! জগু মেরেচে বুঝি!
আহ্লাদি: সেদিন রাতে মাতাল হয়ে এয়েলো, আমারে কলো, কই বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনিছিস? আমি কলাম, আমার বাবা টাকা পাবে ক’নে? যা ছিল সব বেচে বেচে তো এনে দিয়েচি, আর পারব নানে। এইটা শুনে আমারে যে মার মারলে গো কাকি মা। ধুনো কাকা এসে না বাঁচালে তো মরেই যেতুম। তোমারে বলেনি কাকাবাবু?
মহিলা: কই না তো!
আহ্লাদি : সারা রাত আমারে খুঁটির সঙ্গে বান্ধে রাখেলোগো কাকি মা। সকালে উইঠে আবার পাগল হইয়ে আমারে কলকে আগুনের ছ্যাকা দিলে। শরীল পুড়ে আঙ্গার হইলো, অন্তরটাও কালা হয়ে গেলো। আর যেন পারি না!
মহিলা: ও মা-গো! মানুষ এতো নিঠুর হয় নাকি! কি সুন্দর ম্যায়াডারে জ¦ালায়ে-পুড়্যে মারলেগো! শোন, আমি বলি ি ক, আর তুই নিজ্জাতন সহ্য করবি নে। তোর পেটের সন্তানকে বাঁচাতি হবি। তুই বাপের বাড়ি চলি যা, এই অত্যাচার সহ্য করার চেয়ি না মা-বাপের সঙ্গে না খেয়ি মরা ভালো।
(দূর থেকে জগুর ডাক শোনা যায়: ‘আহ্লাদি, ওই আহ্লাদি, কনে গেলিরে’)
ওই যে আয়েছে জগু বদমাশটা, যা গে মা সাবধানে থাকিস।
দৃশ্য: ২
জগু: কিরে কোন্ নাগরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েসিলি?
আহ্লাদি: বাজে কথা বইলবে না, তোমারেই সামাল দিতে পারছিনে আবার নাগর করতে যাব কখন? হাত-মুক ধুয়ি আসো ভাত বাড়ে দিচ্চি।
জগু: আরে মাগির ছাও, ভাত খাবো পরে বাপের বাড়িততন টাকা আনিচিস?
আহ্লাদি: আমি তো বলেছি, তোমার মদ খাওয়ার টাকা যোগার করার সাদ্য মোর বাপের আর নেইকো।
জগু: (খুব রেগে) কী! তুই যাসনি তালে বাপের ঘরে? আইজকে তর একদিন কি আমার একদিন। (আহ্লাদিকে মারতে শুরু করে।)
আহ্লাদি: আমারে আর মেরো না গো, আমার প্যাটে যে তোমারই সন্তানগো, ওরে বাঁচতি দাও, আমারে বাঁচতি দাও, আর মেরোনাকো আমারে। (লাথি মেরে আহ্লাদিকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় বোঝা যাবে তাকে বাপের বাড়ি টাকা আনতে পাঠানো হচ্ছে)
দৃশ্য: ৩
(একটি জঙ্গলময় পথ। আহ্লাদিকে আলুথালু অবস্থায় আসতে দেখা যায়। পথে কৈলাসের সঙ্গে দেখা হয়। কৈলাস হন্তদন্ত হয়ে কোথাও যাচ্ছিল)
কৈলাস: আহ্লাদি, এই আহ্লাদি কনে যাচ্চিস?
আহ্লাদি: ক’নে আর যাবো কৈলাস দা, বাপের কাছে যাই।
কৈলাস: ওরে এখন যাসনে ও বাড়িতে। জ্যাঠা মশাইকে ওলায় ধরেছে তুই জানিসনে?
আহ্লাদি: কওকি, কখন থেকে? আমার বাবাকে বাঁচাতে পারলি না তোরা? মা-ভাইবোন সব না খেয়ে মরল, এখন বাপটাকেও ধরলো ওলা রোগে ও ভগবান তুমি রক্কা করো, আমার বাবাকে রক্কা করো (যেতে চায়)
কৈলাস: এখন ও বাড়িতে যাসনে, শেষে তুইও যমের পাল্লায় পড়বিরে। তুই ছাড়া ওই বংশে আর আচে কে বল?
আহ্লাদি: না, আমি যাবোই, না হয় মরবো। এমনি মরার মতো বেঁচে আছি, জীবন রেখেও কি শান্তি আছে কৈলাস দা?
কৈলাস: কী হয়েছেরে তোর? জগু আবার মারিছে বুঝি! এবার পাই জগুকে, দেখপানে কত ক্ষমতা মারে আমার বোনেরে!
আহ্লাদি: হয়, দেখিছি না তোমার কত ক্ষমতা, দেখা হলি দুই বন্ধু এক হইয়ে আবার নেশায় মইজে যাপা। যাই কৈলাস দা, বাবারে দেখিগে—
কৈলাস: যা, কিন্তু আহ্লাদি সাবধানে থাকিস কলাম, দুর্ভিক্কে আর কলেরা রোগে গোটা গ্রাম সাফ হইয়ে গেছে। আর কটা লোক ক’দিন যে বাঁচপো তার ঠিক নেই, হে ভগমান, তুমি সহায়, মা–দু¹া দু¹া দু¹া…

দৃশ্য: ৪
(আহ্লাদি’র বাবা মারা গেছে। ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। আহ্লাদি চিৎকার করে ঘরে ঢোকে। সেখানে আহ্লাদির বাবাকে মৃত দেখানো হয়। সেখানে মাসি ও পিসিকে দেখানো হয়)
(এই ফাঁকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নাম দেখানো হবে…একটি গান দেওয়া যেতে পারে: একই সঙ্গে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো দেখানো হবে)
দৃশ্য: ৫
(একটি ঘরে দুটি বিছানা। একটি বিছানায় মাসি ও পিসি বসা। অন্য বিছানায় বসা আহ্লাদি। মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ারে বসা জগু)
মাসি: বাবা জগু, আমরা কচ্ছিলাম কি, আর কটা দিন থাকি যাক না মেয়েডা!
জগু: আমি অত কথা বুঝিনে মাসি, শোনেন পিসি, এই চারবার নিতে এলাম আহ্লাদিরে। নানান কতা কইয়ে আমার সঙ্গে টালবাহানা করতিছেন। আমি কতা দিচ্ছি আর আহ্লাদির ওপর কোনো অত্যাচার করবো না। আমি ভালো হইয়ে গেসি।
আহ্লাদি: ইস্ ভালো হইয়ে গেসে। এইরাম কথা কতোবার বলিছো আগে। রাইতের বেলা যকন গিলাসে গিলাসে গিলে গিলে আসো তকন মনে থাকে এসব চিরা ভিজানো কতা?
জগু: শোন্ আহ্লাদি মিছা কতা কলি ভালো হবিনানে কিন্তুক বইলে দিচ্ছি।
পিসি: শোন জামাই, আর কতা বাড়াইও না, আমি কই তুমি না হয় আর কটা দিন থাকি যাও। এই অবস্তায় মেয়াটাক পাটালি ওর শরীল সইতি পারবি না বাবা।
জগু: শোনেন পিসি আমি একটা মুহুত্তও আর একানে থাকবো না। দেকি আপনারা কতদিন আহ্লাদিকে আটকি রাখতি পারেন। তবে আমি এই কয়া দিচ্ছি আমারে ক্ষ্যাপালে আপনাগের ভালো হবিনানে কিন্তু। (জগু উঠে চলে যায়)
মাসি: ও বাবা জগু শুইনে যাও বাবা রাগ করতি নেই
পিসি: এরাম সময় রাগ করতি নেই জামাই শুইনে যাও বাবা। আর দুটা দিন থাইকি যাও। (জগু হনহন করে চলে যায়)
মাসি: যাকগো বিয়াইন যাতি দেও তো। রাগ কমলি আবার চলে আসপে জামাই দেখো এখন।
আহ্লাদি: ইস্ খাওয়ানোর মুরোদ নেই, আবার দেমাক কতোÑ হুহ্ । শোনো মাসি-পিসি, শোন পিসি জামাইকে বেশি আদর দিয়ে তোমরা মাথায় তুলি ফেলেছ, আর সামলাতে পারবা না কিন্তু।
পিসি: তুই চিন্তা করিস না আহ্লাদি মা। তকে আমরা রক্ষা করবোই। যা এখন নেয়ে খেয়ে একটু শুয়ে পড়গে, বিশ্রাম করগে যা।
আহ্লাদি: তাই যাচ্ছি, তোমরা খেয়ে তবে কই যাবে যেওÑÑ(আহ্লাদি চলে যায়)
পিসি: এতো আদর কল্লাম জমাইকে, আমাদের মান বুঝলে না। আচ্ছা বেয়াইন একটা কতা কওতো এই এখন আমাগের এই তিনজনের সংসার চলবি কেমন করে‌্য? যা ছেল, ছাগলটা তা-ও তো বেচ্যে জামাইকে খাওয়ালে। গলা কেটে রক্ত দিয়ে ধার শোধ করতি পারি, কিন্তু মেয়ারে অন্ন দেওয়ার ক্ষমতা কোথায় পাব?
মাসি: ঠিকই বলিছ বেয়াইন মেয়ার দায়িত্ব পালাম কিন্তু খাওয়ার ব্যবস্থা পালাম না। না খায়ি কত মানুষ মরি গেইল তার তার ইয়ত্তা আছে?
পিসি: হুঁ, কত কী না করলাম! পরের বাড়ি ধান ভানলাম, কাঁথা সেলাই করলাম। এরবাদে ডালের বড়ি বেইচে, হোগলা গেঁথে, শাকপাতা ফলমূল ডাটা কুড়িয়ে, এটা ওটা যোগাড় করে আর কত চলতে পারি। কোনোতেই যে তিনবেলার সংসার চলে না!
মাসি: এক সময় ভালোই ছিলাম, মনে নেই একবার বেশ পুঁজি হলো, তোমার আমার। রূপোর টাকা-আধুলি সিকি!
পিসি: খুব মনে আছে, একবার যে তোমার আমার মহা-ঝগড়া বেঁধে গেলো, জমানো টাকার ভাগ নিয়ে ভুলে গিয়েছ? যাক ওসব কথা একন মনে করে চলবে তাই বলো-
মাসি: একটা কাজ করবি বেয়াইন? শহরের বাজারে তরিতরকারি ফলমূলের দাম চড়া। গাঁ থেকে কিনে যদি বাজারে গিয়ে বেচে আসি, তবে কিছু রোজগার হবে। তাতে তোরও দুটো পয়সা আসে, মোরও দুটো পয়সা আসে।
পিসি: ও নৌকা ঠেলা কাজ আমি কততে পারব না।
মাসি: আমিতো একা ভরসা পাই না বেয়াইন, কিন্তু কী করবো তুমি না গেলেতো আমারে একাই করতি হবি।
পিসি: তোমাকে একা রোজগার করতে দেব না। আমিও যাব। কাল তেকেই শুরু করি চলোÑ
দৃশ্য: ৬
(আহ্লাদিকে দেখা যাবে গোসল করে বাড়ির আঙিনায় কাপড় শুকাতে দিচ্ছে। একজন যুবক আসে।)
যুবক: কেমন আছো আহ্লাদি? তোমাকে যা সুন্দর লাগতিছে না! আহ্ উহুরে!
আহ্লাদি: বাজে কথা কবা না, নরেশ, কী কতি এসেছো তাই কও–
যুবক: সব কথা কতি আসিছিরে একটু ঘরে চলো—
আহ্লাদি: একন ঘরে যাবো কেনে, মাসি-পিসি ঘওে নেই, সালতি নিয়ে সেই সকালে বেরিয়েছে, শাক-সবজি বেচতি গেছে…
যুবক: সবই জানিরে আহ্লাদি, মাসি-পিসি নেই বলেইতো এখন এসেছে, তরে সুখ-দুখের দুটো কতা কবো…
আহ্লাদি: তাই নাকি, শখতো বড়ো বাড়িছে বড়ো, মাসি-পিসি শুনলি তোমারে ছেঁইচে দেবেনে তা-কি জানো?
যুবক: ও মেলা দেখিছি, আয় নারে ঘরে (হাত ধরে)
আহ্লাদি: ছাড়, ছাড় বলচি, নইলে এক্ষুণে ভালা হবে না বলে দিচ্চি
যুবক: আরে নইলে কটা টাকাই নিবি
(আরো দুজন যুবক প্রবেশ করে)
যুবক-১: এই কেরে তুই আহ্লাদিকে ত্যক্ত করিস, জানিস আমরা কারা?
যুবক: তুমি যে-ই হও, আহ্লাদি শুধু আমারই থাকপে
যুবক-২: এই জমিদার গোকুলের নাম শুনিছ? আমরা জমিদারের লোক, জমিদার সাব আসতিছে, সর কলাম
যুবক: আরে-তুমি যে-হও, আমার ডর নেই, আমি ডরাই না
(জমিদার আসে)
জমিদার: এই কী হয়েছে রে, এটা কেঠা?
যুবক-২: মহাজন, দেখিছেন এই বোকা নরেশ আপনার কথা শুইনেও আমাদের কোনো মূল্য দেচ্ছে না।
জমিদার: কী ওর এতো সাহস হয়েছে, ওর দাঁত কডা ফালায় দিচ্ছিস না কেন?
যুবক: ও মহাজন আপনে, আমি চিনতে পারিনি…আমারে মাফ করি দেন
জমিদার: এখন চিনেছিস তো আমি গোকুল জমিদার, যা এখন–
যুবক-১: যা যা, ভালো হোস তো আর মতিবুদ্ধি করিসনে।
যুবক: যাচ্ছি যাচ্ছি মহাজন…
জমিদার: এই তোরা যাচ্চিস না ক্যা, আমার উপহারডা আহ্লাদিকে দিয়েচিস?
যুবক-১: ও ভুলি গিয়েছি মহাজন, এই নেও আহ্লাদি দি তোমার সাজের সওদা, জমিদার সাব শহর থাকি আনিছেন।
আহ্লাদি: আমি ওটা নেবো কেন? আমার ওসব দরকার নেই।
জমিদার: ঠিক আছে, আমারে দে, আমি দেই, এই তোরা যাস না কেনে?
(যুবক দুজন চলে যায়)
নেও আহ্লাদি, আমার শুবেচ্চা গ্রহণ করো।
আহ্লাদি: আপনি জমিদার মানুষ, আপনারি খুব সম্মান করতাম, কিন্তু সম্মানের আর কিচু রাখলেন না
জমিদার: ক্যান,আমি অসম্মানের কি করিছি, তোমরা পছন্দ করি সেটা কি খারাপ কও–
আহ্লাদি: হ, আমার বাপের জমিগুলান ক্যামনে ক্যামনে নিলেন, এখন আমারেও নেন যা খুশি করেন, আমাগের কি শক্তি আছে কি কব আমরা?
জমিদার: ওসব কতা এখন ছাড়ো আহ্লাদি, আমার সঙ্গে গেলি তোমার সব জমি তোমারে দিয়ে দিবানে
(মাসি-পিসি ঢোকে)
মাসি: মহাজন সাব আপনে?
পিসি: আপনে এই অবেলায় কেনে জমিদার সাব?
জমিদার: না কচ্ছিলাম কি, আহ্লাদিতো বাড়িতে বইসেই থাকে, আমার সেবা যতিœর জন্যে এটটু যদি আমার কাচারি ঘরে যেতো, তো তোমাদের আর কাজ করতি হতো না। আমি ম্যালা টাকা দিতাম
মাসি: ওসব টাকা আমাদের লাগবি না।
পিসি: মানে মানে আপনি যান মহাজন বাবু নইলে আমাদের মুখ ফসকি খারাপ কথা চলি আসতি পারে
জমিদার: যাচ্ছি তবে, ব্যাপারটা একটু ভাইবে দেইকো, এই বিধবা বয়সে কাজ করতি ভালো লাগে বলো
মাসি: আপনি যান কচ্ছিÑ
জমিদার: আরে যাচ্ছি যাচ্ছি, জমিদারকে কত সম্মান করে মানুষ তোমরা জানো? ভুলি যাচ্ছ সব যে! (জমিদার চলে যায়)
আহ্লাদি: ও মাসি কাল থেকে যকন সকালে বেরোবে আমারেও নিয়ে যাবে। সারাদিন পাড়ারা লম্পটের ত্যাক্ত করে, বিরক্ত করে জীবনটা আর ভালো লাগে না গো মাসি, ওপিসি কী বলিছি শুনিছ
পিসি: তাই হবে আহ্লাদি, কাল থেকে তুই ও যাবি আমাদের সাথে সালতিতে বসি থাকপি সারাদিন।

দৃশ্য: ৭

মাসি: ফের আসুক, আদরে রাখব যদ্দিন থাকে। বজ্জাত হোক, খুনে হোক, জামাই তো। ঘরে খাতির না করব কেন? তবে মেয়া মোরা পাঠাব না।
পিসি: নে কৈলেশ, মরতে মোরা মেয়া পাঠাব না।

(জলবেষ্টিত গ্রামের পাশে একটি খাল। খালের ওপর একটি কংক্রিটের পুল। খালের পানিতে ভাটা। পুলের নিচে দুটো খড়বোঝাই সালতি (নৌকা)। তিনজন লোক খড় তুলে নিয়ে পাড়ে স্ত‚প করছে। ওদের মাথায় খড় তুলে দিচ্ছে কৈলাস ও বুড়ো রহমান।)
কৈলাস: রহমান কাকা, তাড়াতাড়ি করো, আবার বিষ্টি আসতি পারে।
রহমান: শরীলডা আর চলছে না কৈলেস। বড়ো কাবু হইয়ে গেসি।
কৈলাস: সে কি কাকা, তোমারে তো এরম কত কখনও বলতে শুনিনি। ভাত খেয়িছ সকালে, মন-টন খারাপ মনে হচ্ছে!
রহমান: মেয়েডার জন্যি পরানডা পোড়ায় কৈলেস। অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছি। শ^শুরঘরের মার সইতে না পারি চলি আসলো। কিছুতেই আর যেতে চায়নি। দাপাদাপি করে কেঁদেছিল যাওয়া ঠেকাতে। ছোট অবুঝ মেয়ে! ওর ভালোর জন্যই জোর করে মেয়েডারে পেটিয়ে দিলাম। সেই যাওয়াই শেষ হবে কিডা জানতো! (চোখ মুছে বুড়ো রহমান)
(অন্য একটি সালতি কাছে এগিয়ে আসে। সালতির দুমাথায় প্রৌঢ়া বিধবা মাসি-পিসি। দুজনরেই কোমরে আঁচল বাধা) মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে অল্পবয়সি আহ্লাদি। আহ্লাদির পরনে সস্তা শাড়ি)
রহমান: মাসি-পিসি হাটেত-তন ফিরছে কৈলেস।
(কৈলাস বাহকদের মাথায় খড় চাপাতে ব্যস্ত ছিল। আঁটিটা তুলে দিয়ে মাসি-পিসিকে হাঁক দেয়)
কৈলাস: ও মাসি, ওগো পিসি, রাখো রাখো। খপর আছে শুনে যাও।
(মাসি-পিসি সালতির গতি ঠেকিয়ে পাড়ে ভিড়ায়। আহ্লাদি সিঁথি পর্যন্ত ঘোমটা টেনে দেয়)
মাসি: (বিরক্তির সঙ্গে) বেলা আর বেশি নেই কৈলেস।
পিসি: অনেকটা পথ যেতে হবে কৈলেস।
(কৈলাস এদিক সেদিক তাকিয়ে কথা বলতে ইতস্তত করে। একবার আহ্লাদির দিকে একবার মাসি-পিসির দিকে তাকায়। তারপর কথা বলে গলা কাঁপিয়ে)
কৈলাস: বলি মাসি, তোমাকেও বলি পিসি। মেয়াকে একদম শ^শুর ঘরে পাঠাবে না, সে কেমন ধারা কথা হয়? এতো বড়ো সোমত্ত মেয়া, তোমরা দুটি মেয়ে লোক বাদে ঘরে একটা পুরুষ মানুষ নেই, বিপদ-আপদ ঘটে যদি তো?
মাসি: খুনসুটি রাখো দেখি কৈলেশ তোমার। মোদ্দাকথাটা কি তাই কও। বললে না যে খপর আছে, কী?
পিসি: খপরটা কী তাই কও। বেলা বেশি নেই কৈলেশ।
কৈলাস: (ইতস্তত করে) জগুর সাথে দেখা হলো কাল। খড় তুলে দিতে দিতে সাঁঝ হয়ে গেল, তা এটটু-মানে আরকি দোকানে চা খেতে গেছি চায়ের দোকানে জগুর সাথে দেখা।
মাসি: চায়ের দোকান না কিসের দোকান তা বুঝিছি কৈলেশ, তা কথাটা কী?
পিসি: সেথা ছাড়া আর কোথা দেখবে ওকে। হাতে দুটো পয়সা এলে তোমারও স্বভাব বিগড়ে যায় কৈলেশ। তা, কী বললে জগু?
কৈলাস: (যেন বিপদে পড়ে যায়, জবাব খুঁজে পায় না, হঠাৎ কথা বলতে চেষ্টা করে) ওসব একরকম ছেড়ে দিয়েছে জগু। লোকটা কেমন বদলে গেছে মাসি, সত্যি কথা পিসি, জগু আর সেই জগু নেই। বৌকে নিতে চায় এখন। তোমরা নাকি পণ করেছ মেয়া পাঠাবে না, তাতেই চটে আছে। সম্মানতো আছে একটা মানুষের, কবার নিতে এল তা মেয়া দিলে না। তাই তো নিতে আসে না আর। আমি বলি কি নিজেরা এবার যেচে পাঠিয়ে দেও মেয়াকে।
মাসি: পেট শুকিয়ে লাথি ঝাঁটা খেতে? কলকেপড়া ছ্যাঁকা খেতে দিনভর রাতভর?
পিসি: মেয়া না পাঠাই, জামাই এলে রাখিনি জামাই আদরে তাকে? ছাগলটা বেচে দিয়ে খাওয়াইনি ভালোমন্দ দশটা জিনিস?
মাসি: ফের আসুক, আদরে রাখব যদ্দিন থাকে। বজ্জাত হোক, খুনে হোক, জামাই তো। ঘরে খাতির না করব কেন? তবে মেয়া মোরা পাঠাব না।
পিসি: নে কৈলেশ, মরতে মোরা মেয়া পাঠাব না।
(মাসি-পিসি নৌকার লগি তুলে রওয়ানা হতে চায়, বুড়ো রহমান বারবার তাকায় আহ্লাদির দিকে, তার চোখ ছলছল করে ওঠে)
রহমান: না পাঠানোর বুঝটাই ভালো গো দিদি ঠাকরুন। আহ্লাদি মায়ের সঙ্গে আমার মেয়েটার একটা মিল খুঁজে পাই। যদিও দুজনের চেহারায় কোনো মিল নাই, আমার মেয়াটা ছিল আরও রোগা, বয়সেও ছিলো অনেক ছোটগো মা। কিন্তু তোমার মুখের মদ্যি আমার মেয়ার মুখের ছাপ দেখতি পাচ্ছি।
কৈলাস: তবে আসল কথাডা বলি। জগু মোকে বললে, এবার সে মামলা করবে বৌ নেবার জন্য। তার বিয়ে করা বৌকে তোমরা আটকে রেখেছ বদ মতলবে। মামলা করলে বিপদে পড়বে। সোয়ামি নিতে চাইলে বৌকে আটকে রাখার আইন নেই। তাছাড়া তোমরা আহ্লাদির মা-বাপ কেউ নও। কাজেই জেল হয়ে যাবে তোমাদের। আর যেমন বুঝলাম, মামলা জগু করবেই আজ-কালের মধ্যে। মরবে তোমরা জান মাসি, জান পিসি, মারা পড়বে তোমরা একেবারে।
(আহ্লাদি একটা অস্ফুট শব্দ করে বুঝিয়ে দেয় সে স্বামীর বাড়িতে যেতে চায় না, মাসি-পিসি মুখ চাওয়া- চাওয়ি করে)
মাসি: জেলে নয় গেলাম কৈলেশ, কিন্তু মেয়া যদি সোয়ামির কাছে না যেতে চায় খুন হবার ভয়ে?
(মাসি-পিসি রওয়ানা হয়ে যায়, সূর্য অস্ত যাচ্ছে, গাছ-পালায় অন্ধকার নেমে আসছে, একটা-দুটা শকুনি দেখানো যেতে পারে)
কৈলাস: মাসি-পিসির কি ভাব দেখিছাও। শাক-সবজি বেইচ্যে দুহাতে টাকা কামাচ্ছে। গেরস্তের বাড়ি থেকে শাক- সবজি নিয়ে শহরের বাজারে গিয়ে বেইচ্যে আসে। গায়ের বাবু বাসিন্দারাও এখন নগদ পয়সার জন্যি বাগানের জিনিস বেচতি দেয়।
রহমান: মাসি-পিসির ভাব আগেও ছিল কৈলেশ। অবস্থা এক, বয়স সমান, একঘরে বাস, পরস্পরের সুখ-দুঃখের কথা তারা কাকেই বা বলবে, কে-ই বা শুনবে। তবে এক সময় দেখিছি দুজনের হিংসা-দ্বেষ রেষারেষিও ছিল যথেষ্ট, কোন্দলও বেঁধে যেত কারণে অকারণে। পিসি এ বাড়ির মেয়ে এ তার বাপের বাড়ি। মাসি উইড়্যে এসে জুইড়্যে বসেছে এখানে। তাই মাসির উপর পিসির একটা অবজ্ঞা অবহেলার ভাব ছিল। এ নিয়ে পিসির অহংকার আর খোঁচাই সবচেয়ে অসহ্য লাগত মাসির। ধীর শান্ত দুঃখী মানুষ মনে হতো এমনি তাদের। কিন্তু ঝগড়া বাঁধলে অবাক হয়ে যেতাম তাদের দেখি। সে কি রাগ, সে কি তেজ, সে কি গোঁ। মনে হতো এই বুঝি কামড়ে দেয় একে অপরকে, এই বুঝি কামড়ে দেয় বটি দিয়ে।
কৈলাস: কিন্তু মাসি-পিসি যখন থেইকে শাক-সবজি বেইচ্যে বাঁচবার চেষ্টা করিছে তখন থেইক্যে দুজনের হইয়ে গেল একমন, এক প্রাণ। আর সেই মিল জমজমাট হইয়েছে আহ্লাদির ভার ঘাড়ে পড়ায়।
রহমান: হবি না? এখন শুধু নিজেদের পেট ভরানো নয়, নিজেদের বেঁচে থাকা শুধু নয়, তাদের দুজনেরই এখন আহ্লাদি আছে।
দৃশ্য-৮
(নৌকার ওপর মাসি-পিসি ও আহ্লাদি)
মাসি: মেয়া মোরা পাঠাবো না, ওই খুনেদের কাছে মেয়া পাটাতি পারি? যাবার কতা শুনলিই মেয়া যকন আতঙ্কে পাঁশুটে মেরে যাচ্ছে। আমরা আহ্লাদিকে রক্ষা করবোই। খাইয়ে পরিয়ে যতেœ রাখতি হবি তাকে, শ্বশুর ঘরের কবল থেকে বাঁচাতি হবি, গায়ের বজ্জাতদের নজর থেকে সামলে রাখতে হবে, অনেক কাজ, অনেক ভাবনা মোদের।
পিসি: আহ্লাদিকে কোতাও পাঠানোর কতা মোরা ভাবতেও পারি না। জমাই আহ্লাদি নিতে চায় কেন জানো বেয়াইন?
মাসি: তা-কি আর জানিনে! জমি-জমা যা ছেল সব তো গেছে গোকুল জমিদারের কবলে, এখন থাকার জাগাটুকু আছে। মুফতে যা পায় তাতেই জগুর লোভ বুঝিনি?
মাসি: কৈলাশের কতায় তুই ডরাসনি আহ্লাদি। ভাঁওতা দিয়ে মোদের দমাবার ফিকির সব। নয়তো কৈলেশকে দিয়ে ওসব কথা বলায় মোদের?
পিসি: দুদিন বাদে ফের আসবে দেখিস জামাই। তখন শুধোলে বলবে কই না, আমি তো ওসব কিছু বলিনি কৈলেশকে।
মাসি: পেটের সন্তান চার মাসি পড়লো। আর কটা দিন বা। মা-মাসির কাছেই রইতে হয় এ সময়টা। জামাই এলে বুঝিয়ে বলবো।
পিসি: ছেলের মুখ দেখে পাষাণ নরম হয় জানিস আহ্লাদি। তোর পিসে ছিল জগুর মতো। খোকাটা কোলে আসতে কি হয়ে গেল সেই মানুষ। চুপি চুপি এসে এটাওটা খাওয়া, উঠতে বলি তো ওঠে, বসতে বলি তো বসে।
মাসি: তোর মেসো ঠিক ছিল। শাউড়ি ননদ ছিল বাঘ। উঠতে বসতে কি ছ্যাচা খেয়েছি ভাবলে বুক কাঁপে। কিন্তু জানিস আহ্লাদি, মেয়েটা যেই কোলে এল, শাউড়ি ননদ যেন মোকে মাথায় করে রাখলে বাঁচে।
পিসি: তুইও যাবি, সোয়ামির ঘর করবি। ডরাসনি। ডর কিসের?
(বাড়ির কাছাকাছি এসে যায়।)
দৃশ্য: ৯
(একটি ঘাটে কয়েকজন মানুষ মাসি-পিসির কাছে শাকসবজি দরদাম করছে। )
লোক-১: চিচিঙ্গে কত কইরে?
মাসি: চার আনা সের?
লোক: কী কইলে এতো দাম, শুধু চিচিঙ্গা দেবে না মানুষ শুদ্দা?
মাসি: কী কতি চাচ্চ?
লোক-: কতি চাচ্চি সঙ্গে কইরে যে সুন্দরী নিয়ে ঘুরতিছো, তারেও বেচপা নাকি?
পিসি: মুখ সামলে কথা ক- বান্দর, চাপা মাইলে দাঁত ফেলা দিব কলাম।
লোক: ওরে বাপরে , এতো ভালো গরম দেখিচি বেধবা মাইনসের
লোক: চল কাইটে পড়ি, স্বামী-সংসার খাইয়েছে নিজেরা না কোন বিপাকে পড়ি…
(জমিদার সাঙ্গ-পাঙ্গসহ আসে)
জমিদার: আহারে এতো সুন্দর চেহারার মানুষটা সারাদিন নৌকায় করি কালো কইরে ফেললে। তোমরা তো বড়ো পাষাণ মাসি-পিসি। ক’টাকার শাক-সবজি আছে কও আমি সব কিন্যে নিচ্ছি। আহ্লাদিকে আমার সঙ্গে দেও, আমার বাড়িতে সব দিয়ে আমার কিছু খেদমত করি চলি আসপিনে?
মাসি: জমিদার বাবু, আমরা গরিব-মুখ্য-সুখ্য মানুষ ভালো ব্যবহার জানিনে। কী করে যে আপনাক কি কব মনে কষ্ট পাতি পারেন। আমি কই কি, মানে মানে কাচারিত যান।
জমিদার: তা তো যাবই, কিন্তু আহ্লাদিকে আমার চাই-ই। আর খপর শুনিছ তো, জগু মামলা করে দিয়েছে তোমাদের বিরুদ্ধে। আজই দারোগা বাবু আসবে তোমাদের ধরি নিয়ে যাবে। জেলও খাটবা। তখন বুঝবানে। আমার কথা শুনলি পরে বাঁচতি পারো।
পিসি: বাঁচতি চাই না, মরলি মরবো, কিন্তু আহ্লাদির কিছু হতি দেবো না।
জমিদার: টাকা নিবা, সুখে থাকবা, রক্ষা পাবা না সবকিছু হারাতে দরিয়ায় পড়বা নিজেরা ঠিক করো, আজ রাত্রিই দেখবা আসল খেলা (জমিদার চলে যায়)
দৃশ্য: ১০
(রাতের বেলা মাসি-পিসিকে রান্না-বান্নার কাজ করতে দেখা যায়।)
মাসি: কিরে মা আহ্লাদি, মন ভার করে বইস্যে আছিস যে, শরীর খারাপ?
আহ্লাদি: না মাসি, শরীল নয়, মনটা কেমন কচ্চে। নিজেকে ছ্যাঁচড়া, নোংরা নর্দমার মতো লাগচে। মোর শরীলে কী বা আচে মাসি মানুষের পর মানুষ তাকাচ্চে আমার দিকে। মোর পেটে সন্তান, এই বুঝও কি মানুষের হয় না?
পিসি: সবাইরে দূর করিছি আহ্লাদি, কিন্তুু গোক‚ল জমিদারের সঙ্গে পারচিনে।
আহ্লাদি: আমার জন্যি তোমরা এতো কষ্ট করতিছ পিসি। কী দুর্ভোগ তোমাদের মোর জন্যি! তোমাদের এতো যন্ত্রণা দেওয়ার চেয়ে আমি নয় ওই পাষÐটার লাথি-গুতা খেতুম।
মাসি: তুই পারতিস মোদের ছেড়ে থাকতে?
আহ্লাদি: তখন পারতুম মাসি, কিন্তু এখন পারব নানে। তোমাদের পাশে না শুলে বুঝি মোর চলবে না আর কোনো দিন।
পিসি: ওসব আর ভাবিসনে আহ্লাদি। চল খেতে বসবি এখন।
(খাবার বারা চলতে থাকে)
মাসি: এবার জামাই যদি আর কোনো কড়া কথা বলবো না। কোনো খোঁচা দিয়ে কথা বলবো না।
পিসি: ঠিকই বলিছ বেয়াইন। উপদেশ দিতে গেলে চটবে জামাই। পুরুষ মানুষ তো যতই হোক তাকে খ্যাপানো মোদের উচিত নয়। তুই আহ্লাদি কোনো কটু কথা বলবিনে জামাইকে।
মাসি: হ, জামাই আসলে এমন ভাব করবি যেন সোয়ামির জন্যি আহ্লাদে গদগদ হয়েছিস। যে কদিন থাকবে জামাই সে যেন অনুভব করে, সে-ই এখানকার কর্তা, সে-ই সর্বেসর্বা।
(বাইরে থেকে কানাই চৌকিদার ডাকে। চৌকিদার, তিনজন পেয়াদা এবং একজন কনস্টেবল মাসি-পিসিকে গ্রেফতার করতে এসেছে)
কানাই: ও দিদি ঠাকরুন ঘরে আছো, ও দিদি ঠাকরুন ঘরে আছো?
(মাসি-পিসি পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। জোরে নিঃশ্বাস পড়ে দুজনের। )
মাসি: ওই বুঝি এলো, জমিদারের পাÐারা!
পিসি: সারাটা দিন গেল লড়ে আর লড়ে। সরকার বাবুর সঙ্গে বাজারের তোলা নিয়ে ঝগড়া করতে অর্ধেক জীবন বেরিয়ে গেল। এখন এল চৌকিদার কানাই!
মাসি: হাঙ্গামা না আসে, গাঁয়ের লোক যখন ঘুমুচ্ছে!
( মাসি-পিসি বেরিয়ে আসে)
কানাই: কাছারিবাড়ি যেতে হবে একবার। জমিদার বাবু ডাকিছেন।
মাসি: এত রাতে?
পিসি: মরণ নেই তোমার জমিদারের?
মাসি: জগু মামলা করিছে। তোমাদের নামে ওয়ারেন হয়েছে। দারোগা বাবু এসে বসে আছেন বাবুর সাথে। যেতে একবার হবেগো দিদি ঠাকরুনরা। বেঁধে নিয়ে যাবার হুকুম আছে।
(মাসি-পিসি মুখে মুখে তাকায়। কাছেই একটা ঝোপে অন্ধকারে কয়েকজন মানুষের নড়াচড়ার শব্দ শোনা যায়। দুটো মাথা দেখা যায় জোছনার আলোয় নড়ছে)
মাসি: (আড়ালে) ওই দেখিছো, মনে হচ্ছে গায়ের গুÐা সাধু বৈদ্যরা। ওই যে বৈদ্যের ফেটি বাঁধা বাবরি চুলওয়ালা মাথাটায় পাতার ফাঁকে জোছনা পড়িছে।
পিসি: হুঁ বুঝিছি, মোরা যাব কানাই আর পেয়াদা কনস্টেবলের সঙ্গে, আর ওরা এসে আহ্লাদিকে নিয়ে যাবে।
মাসি: তা কিছুতে হতি দিচ্ছি না। দাঁড়াও বেয়াইন… শক্তি রাখো, হিম্মত রাখো
কানাই: কি পুটুর পুটুর করতিছো দিদিরা। সময় বেশি নেই কলাম।
মাসি: না কচ্ছিলাম যে, মোদের একজন গেলে হবে না কানাই?
পিসি: আমি যাই চলো।
কানাই: কর্তা ডেকেছেন দুজনকে।
(মাসি-পিসি মুখে মুখে তাকায়)
মাসি: কাপড়টা ছেড়ে আসি কানাই।
পিসি: হাত ধুয়ে আসি একদÐ লাগবে না।
(তাড়াতাড়ি ফিরে আসে তারা। মাসি নিয়ে আসে বঁটিটা হাতে করে, পিসি নিয়ে আসে রামদার মতো একটা কাটারি নিয়ে)
মাসি: কানাই, কত্তাকে বলো, মেয়েনোকের এত রাতে কাচারিবাড়ি যেতে নজ্জা করে। কাল সকালে যাব।
পিসি: এত রাতে কাছারিবাড়ি ডাকতে কত্তার নজ্জা করে না কানাই?
কানাই: (ফুঁসে ওঠে) না যদি যাও ঠাকরুনরা ভালোয় ভালোয়, ধরে বেঁধে টেনে নিয়ে যাবার হুকুম আছে কিন্তু বলে রাখলাম।
মাসি: (বঁটিটা উঁচু করে ধরে দাঁতে দাঁত কামড়ে বলে) বটে? ধরে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবে? এসো। কে এগিয়ে আসবে এসো।
পিসি: আয় না বজ্জাত হারামজাদারা। এগিয়ে আয় না। কাটারির কোপে গলা কাটি দু-একটার।
(কানাইরা দ্বিধাভরে দু’পা এগোয়)
মাসি: শোনো কানাই, একিন্তু এর্কি নয় মোটে। তোমাদের সাথে মোরা মেয়েনোক পারবো না জানি, কিন্তু দুটো একটাকে মারব জখম করবো ঠিক।
পিসি: মোরা নয় মরব।
(মাসি-পিসি গলা ছেড়ে পাড়া-পড়শিকে ডাকতে শুরু করে)
মাসি: ও- বাবা ঠাকুর, ও ঘোষ মশায়- ও জনাদ্দন
পিসি: ওগো কানুর মা, বিপিন!, বংশী…
মাসি: কে, কোথায় আছো তাড়াতাড়ি আসো
পিসি: দুষ্ট বেটারা, পাঁজি বেটারা এসেচে তাড়াতাড়ি আসো
দূরে শোনা যায়: কে-রে চোররে, ডাকাতরে, ধররে পিটারে- মাররে কইরে- লাটি আনরে- দা-খুন্তি আনরে
(অনেক লোক এসে জমা হয়। ততক্ষণে কানাই অদৃশ্য হয়ে যায় দলবল নিয়ে। কেউ কেউ জানালা দিয়ে উঁকি দেয় বাইরে না বেরিয়ে)
মাসি: পালিয়েছে বেটা পাজি হতাচ্ছারা
পিসি: নচ্ছারের দল পালিয়েছে সব।
দৃশ্য : ১১
(একটি বিছানায় তিনজন শোয়া। দু পাশে মাসি-পিসি। মাঝখানে আহ্লাদি)
আহ্লাদি: মাসি, ও পিসি-
মাসি: কী, বলতো, ঘুম আসছে না?
আহ্লাদি: না মাসি। কেমন জানি নিঝুম আর থমথমে মনে হচ্ছে রাত্রিটা।
পিসি: হুম, বিপদে পইড়ে হাঁক দিলে পাড়ার এতো লোক ছুটে আসে, এমনভাবে প্রাণ খুলে এতোখানি জ্বালার সঙ্গে নিজেদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে গোকুল আর দারোগা ব্যাটার চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করতে সাহস পায়, জানা ছিল না মোদের।
মাসি: মোরা হাঁকডাক শুরু করেছিলুম খানিকটা কানাইদের ভড়কে দেবার জন্যে। এতো লোক এসে পড়বে আশা করিনি।
আহ্লাদি: মোদের জন্যে নয়, গোকুল আর দারোগার ওপর রাগের জ্বালাই বুঝি ওদের ঘর থেকে টেনে বার করে এনেছে মনে হলে সকলের কথাবার্তা শুনে।
পিসি: তা-ও তো মোদের সাহস। আর কোনোদিন রাত্রিবেলা এমন কইরে‌্য আসতি বুক কাঁপতি হবে কানাইদের। গোকুল জমিদারটার যদি কিছু শেক্ষা হয়…
মাসি: জানো বেয়াইন, ওর ফের ঘুরে আসবে মন বলছে। এতো সহজে ছাড়বে কি?
পিসি: তাই ভাবছিলাম। মেয়েটাকে কুটুমবাড়ি সরিয়ে দেওয়ায় সোনাদের ঘরে মাঝরাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল সেবার। (খানিক ভাবে দুজনে)
মাসি: সজাগ রইতে হবে রাতটা।
পিসি: তাই ভালো। কাঁথা কম্বলটা চুবিয়ে রাখি জলে, কি জানি কি হয়!
(দুজনে সাবধানে ওঠে, যেন আহ্লাদির ঘুম না ভাঙে)
(ঘড়া থেকে জল এনে কাঁথা আর কম্বল চুবিয়ে ঘরে এনে রাখে)
মাসি: বঁটি আর দাগুলো এখানে রাখলুম।
পিসি: হয়। ঘরে আগুন দিলে আমি কাঁথা কম্বল দিয়ে গোড়ায় চাপা দেব যাতে সহজেই নেভানো যায়। আর তুমি দা-বঁটি নিয়ে তৈরি থাকবা, যেন ইতরগুলো এলে সুবিধা করতি না পারে।
মাসি: যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকলাম, কেউ মোদের রক্ষা করবে সে ভরসাও করিনে। মোরাই যেন মোদের রক্ষা করতি পারি সেই সংগ্রাম কইরেই যাব, যতদিন বাঁচব। মোরা নারী বলে পুরুষের ঘা খেইয়ে মরতি আসিনি।
পিসি: ঠিক বলিছ বেয়াইন, ভোর হওয়া পর্যন্ত মোরা জেগেই থাকবো আজ।

Translate »